আজকাল ওয়েবডেস্ক: কলকাতার ফুটবল মানেই এক অদ্ভুত আবেগের যুদ্ধ। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান, এই নাম দুটো শহরের শিরায় শিরায় ধ্বনিত হওয়া একেকটি হৃদস্পন্দন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড় বদলায়, কোচ বদলায়, কিন্তু ডার্বির উত্তাপ কখনও কমে না। বরং প্রতিটি ম্যাচ নতুন ইতিহাস লেখে, নতুন নায়কের জন্ম দেয়। কখনও তা পুরনো ক্ষতে প্রলেপ দেয় আবার নব আনন্দে জাগিয়ে তোলে। 

তাই ইস্ট-মোহনের বড় ম্যাচ কেবল একটা ম্যাচ নয়। এ কলকাতার হৃদস্পন্দন, যা বছরের পর বছর ধরে একই ছন্দে ধুকপুক করে চলেছে।

আগামী রবিবার সেই ডার্বি। উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে দিয়েছে। রবিবার শহরের সব রাজপথ এসে মিশে যাবে যুবভারতীতে, তা আগাম বলে দেওয়াই যায়। ময়দানের আকাশ বাতাসে ভাসছে, ডার্বি যার, আইএসএল তার। 

লেসলি ক্লডিয়াস সরণীর ক্লাব দারুণ এক সন্ধিক্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে। আইএসএলে যোগ দেওয়ার পর থেকে ব্যর্থতাই নিত্যসঙ্গী থেকেছে লাল-হলুদের। এবার অস্কার ব্রুজোঁর কোচিংয়ে ইস্টবেঙ্গল ইতিহাস তৈরির সামনে। আসন্ন ডার্বির আগে দ্রিমিদ্রিমি কাঁপছে শহর কলকাতা। 

Basundhara kings president Imrul Hasan wishes luck to East Bengal's new coach Oscar Bruzon spt

এই আবহে পদ্মাপার থেকে ভেসে এল ডার্বি-বার্তা। বসুন্ধরা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসান বলে দিলেন, ''ভারতের সব ক্লাবগুলোর মধ্যে আমার পছন্দ ইস্টবেঙ্গলই। ইস্টবেঙ্গলের জন্য শুভেচ্ছা রইল।'' আইএসএলে কোন দল কোন অবস্থানে রয়েছে তা নখদর্পণে ইমরুল হাসানের। ভারতের মেগাটুর্নামেন্ট সম্পর্কে সমস্ত খোঁজখবরই রাখেন তিনি। তাই বলছেন, ''ম্যাচ ভাল হোক। সমর্থকরা আনন্দ পাক এটাই চাই।'' 

ওপার জিতে এপারে এসেছেন অস্কার ব্রজোঁ। বসুন্ধরা কিংসের প্রাক্তন কোচের হাতেই এখন ইস্টবেঙ্গলের জিয়নকাঠি। লাল-হলুদ সমর্থকরা আশায় বুক বাঁধছেন,  দুঃসময় কাটিয়ে স্প্যানিশ কোচ অস্কার সুসময় ফেরাবেন ইস্টবেঙ্গলে। 

জমকালো মঞ্চে সোনালি রঙের খাম খুলে বিখ্যাত তারকারা বলে থাকেন, ''অ্যান্ড দ্য অস্কার গোজ টু...।'' 

অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের এই ছবি বহু চেনা। আর বাক্যবন্ধনীও বহু শ্রুত, বহু পরিচিত। সেই সুরেই ডার্বির আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যুৎসাহী লাল-হলুদ সমর্থকরা বলছেন-লিখছেন, ''অ্যান্ড অস্কার গোজ টু...।'' 

অভিজ্ঞ ইমরুল হাসান বলছেন, ''অস্কার খুব ভাল কোচ। ওর ম্যাচ রিডিং বেশ ভাল। কোন সময়ে কাকে পরিবর্তন করলে কাজ হবে, তা ওর ভালই জানা। ফুটবলারদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে নিতে ওস্তাদ। বসুন্ধরায় থাকার সময়ে অস্কার আমাদের সাফল্য দিয়েছে।'' 

বসুন্ধরা ক্লাবের চার প্রাক্তনী ছড়িয়ে রয়েছেন কলকাতা ময়দানের দুই বটবৃক্ষ ক্লাবে। অস্কার ব্রুজোঁ, মিগুয়েল ও স্যানচেজের ঠিকানা ইস্টবেঙ্গল। অন্যদিকে রবসন এখন বাগানে। ডার্বিতে লড়াই অস্কার বনাম রবসনের। গুরু বনাম শিষ্য। অন্যদিকে দুই সাম্বা ম্যাজিশিয়ানের কাছেও ব্যক্তিগত লড়াই। মিগুয়েল বনাম রবসন। 

ইমরুল হাসান বলছেন, ''দেখুন বসুন্ধরার তিনজন রয়েছেন ইস্টবেঙ্গলে। আর মোহনবাগানে রয়েছে আমাদের ক্লাবের একজন। ফলে পাল্লাভারী ইস্টবেঙ্গলের দিকেই। আমি নিজেও ইস্টবেঙ্গলকে পছন্দ করি। তাই বলছি, ডার্বিতে রবসন ভাল খেলুক তবে মিগুয়েল জিতে যাক।'' 

একসময়ে সবাই ধরেই নিয়েছিলেন ইস্টবঙ্গল পথভ্রষ্ট হয়েছে আইএসএলে। কিন্তু সেই লাল-হলুদ ব্রিগেডই ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সামনে। 

মোহনবাগান আবার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পয়েন্ট খুইয়েছে। কিন্তু সের্জিও লোবেরার দল যে কোনও সময়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। গতবারের ভারতসেরা সবুজ-মেরুন। ডার্বিতে দুই প্রধানের উপভোগ্য লড়াই দেখার জন্য প্রহর গুনছে শহর কলকাতা। 
ইমরুল হাসান স্মৃতির পাতাও উলটে দেখছেন সেই সময়কে, যখন বসুন্ধরায় অস্কারের সাফল্যের পিছনে ছিল শক্তিশালী স্কোয়াডের বড় ভূমিকা। 


তিনি বলছেন, ''বসুন্ধরায় অস্কার এত সফল, তার কারণ আমরা খুব ভাল দল দিতাম ওকে। আমাদের ক্লাবের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্য ক্লাবগুলোর শক্তির পার্থক্য ছিল অনেকটাই। কয়েকবছর আগে ইস্টবেঙ্গলে ছিল রক্তাল্পতা। অন্যদিকে মোহনবাগান খুব শক্তিশালী। সেই কারণে ইস্টবেঙ্গল বারংবার হেরে যেত মোহনবাগানের কাছে। আমাদের এখানেও সেই একই ব্যাপার ছিল।'' 

এইভাবেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অতীতের স্মৃতি আর বর্তমান মিলিয়ে ডার্বি হয়ে উঠছে আরও আকর্ষণীয়, যেখানে শুধু তিন পয়েন্ট নয়, জড়িয়ে আছে বহু পরিচিত মুখের মর্যাদার লড়াইও। 

ইস্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে অস্কার ফুটবলারদের পজিশন বদলে দিচ্ছেন খেলায়। বিষ্ণুকে পাঠিয়ে দিয়েছেন সাইড ব্যাক পজিশনে। একটি ম্যাচে বিপিনকেও সাইড ব্যাকে খেলান স্প্যানিশ কোচ। ইমরুল হাসান বলছেন, ''অস্কার আমাদের এখানেও খেলোয়াড়দের পজিশন বদলে দিত। সুফিল, ইব্রাহিম, রিমনের মতো আপফ্রন্টে খেলা ফুটবলারদের রক্ষণে নামিয়ে দিয়েছিল।'' 

ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন অস্কারকে ঘিরে। মোহনবাগানবিশ্বও তাকিয়ে সের্জিও লোবেরার মগজাস্ত্রের দিকে। রবিবার দুই মায়েস্ত্রোর বুদ্ধিযুদ্ধ। কে জিতবে? কে হারবে? আইএসএল ট্রফি যাবে কোন ক্লাবে? ইমরুল হাসান বলছেন, ''ইস্টবেঙ্গল আইএসএল জিতলে মিষ্টি যেন পাই।''  

ডার্বির আগে শেষ কথা একটাই, মাঠই বলে দেবে, কার কৌশল জেতে, আর কার স্বপ্ন ভাঙে।