কৃশানু মজুমদার: ফুটবলে কিছু গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায় না, বদলে দেয় কোচের ভাগ্য, পরিচিতি দিয়ে যায় তাঁকে। সিলমোহর দিয়ে যায় তাঁর দক্ষতাকেও।
ঠিক এক যুগ আগে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে ইতিহাস লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন সোদপুরের মহম্মদ রফিক।
আইএসএলের প্রথম সংস্করণের ফাইনালে কুড়ি মিনিট মাঠে ছিলেন এই বঙ্গসন্তান। খেলার একেবারে শেষ লগ্নে তাঁর হেড কেরালা ব্লাস্টার্সের জালে জড়িয়েছিল।
দীর্ঘ চেহারার গোলকিপার ডেভিড জেমস শরীর ছুড়েও সেই বলের নাগাল পাননি। রফিকের গোলে প্রথমবার আইএসএল জিতেছিল অ্যাটলেটিকো কলকাতা।
ভারতীয় ফুটবলে নিজের রাজত্বের প্রথম ইটটি বসিয়েছিলেন আন্তোনিও লোপেজ হাবাস।
সময় বদলেছে। গঙ্গা দিয়ে গড়িয়ে গিয়েছে অনেক জল। আন্তোনিও লোপেজ হাবাস কালক্রমে ভারতের মাটিতে অন্যতম সফল কোচ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এবার তাঁর হাতেই উঠেছে ইস্টবেঙ্গলের রিমোট কন্ট্রোল।

আবার সে এসেছে ফিরিয়া। কলকাতাতেই ফিরে এলেন স্প্যানিশ মায়েস্ত্রো। তবে এবার নতুন ঠিকানা ইস্টবেঙ্গল।
অস্কার ব্রুজোঁর অধ্যায় শেষ লাল-হলুদে। শুরু হল হাবাস যুগ। আর সেই প্রত্যাবর্তনের দিনে অতীতের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁরই এক পুরনো সৈনিক। মহম্মদ রফিক। যাঁকে হাবাস 'রফিকে' বলে ডাকতেন।
রফিকের কণ্ঠে আজও শ্রদ্ধা আর আবেগের মিশেল। তিনি বলেন, ''হাবাস স্যর পোড়খাওয়া কোচ। ইস্টবেঙ্গল নিঃসন্দেহে ভাল ফল করবে স্যরের কোচিংয়ে। পরিকল্পনার বাইরে কখনও যান না স্যর। আমি অনেক কোচের অধীনে খেলেছি, কিন্তু হাবাস স্যর সবার থেকে আলাদা। তাঁর অভিজ্ঞতা অফুরন্ত, আর শৃঙ্খলাই তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।''
আইএসএলের একাধিক ক্লাবে খেলেছেন রফিক। ইস্টবেঙ্গলের লাল-হলুদ জার্সিতে দাপিয়ে খেলেছেন। ভারতীয় ফুটবলের নাড়িনক্ষত্র তাঁর জানা।

রফিকের কাছে হাবাস শুধু একজন সফল কোচ নন, তিনি একজন নির্মোহ নেতা। দলের স্বার্থই তাঁর কাছে সবার আগে। প্রয়োজন হলে লুইস গার্সিয়ার মতো তারকাকেও বেঞ্চে বসাতে দ্বিধা করেননি। ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল, এই দর্শনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। এনে দিয়েছে সাফল্য আর সাফল্য।
তবে হাবাসকে নিয়ে রফিকের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি সেই আইএসএল ফাইনাল। কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ৭৪ মিনিট পর্যন্ত বেঞ্চে বসে থাকা এক তরুণ। মাঠে নামার আগে কোচের একটাই কথা, ''রফিকে, ফাইনালটা উপভোগ করো।''
সেই কথার মধ্যেই ছিল শিষ্যের প্রতি আস্থা, ছিল সাহস, ছিল একজন কোচের নিঃশব্দ বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিয়েছিলেন রফিক। অ্যাডেড টাইমে তাঁর হেডই এনে দিয়েছিল জয়সূচক গোল। হাবাসের ভারত অধ্যায়ের প্রথম সোনালি শিরোপা। যে গোলের কথা বলতে গিয়ে এখনও আবেগে ভেসে যান রফিক, ''ফাইনালে খেলার স্বপ্ন প্রত্যেক ফুটবলারেরই থাকে। আমারও ছিল। সেই কুড়ি মিনিটই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সুযোগ পেয়েছিলাম, আর নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমি দলের নায়ক হতে পেরেছিলাম।''
হাবাসের ফুটবল দর্শনও রফিকের কাছে স্পষ্ট। আক্রমণের ঝলক নয়, ফলাফলই শেষ কথা। ''স্যর বলতেন, ছয় গোলে জিতলেও তিন পয়েন্ট, এক গোলে জিতলেও তিন পয়েন্ট। তাই স্যরের একটাই লক্ষ্য, ম্যাচ জেতো, ট্রফি জেতো।”

স্যাপিশ কোচ হাবাস বঙ্গসন্তানকে বলেছিলেন, ''পরিশ্রম করে যাও। একদিন সেই পরিশ্রমের ফল মিলবেই।” সেই কথাই আজও রফিকের জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা।
অস্কার ব্রুজোঁর বিদায়ের পর নতুন কোচ, নতুন ফুটবলার, নতুন পরিকল্পনা, এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চায়ের পেয়ালায় উঠছে তুফান। রফিক মনে করেন, ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় সমস্যা বরাবরই সেট টিম ধরে রাখতে না পারা। তবুও তিনি আশাবাদী, ''হাবাস স্যর জানেন কীভাবে সফল হতে হয়। তাঁর হাত ধরে ইস্টবেঙ্গল অনেক দূর যাবে।''
সময় এগিয়ে গিয়েছে। গুরু আর শিষ্যের দেখা হয় না আগের মতো। কথাও হয় না। তবু রফিক জানেন, আবার যদি কোনওদিন মুখোমুখি হন, হাবাস তাঁকে আগের মতোই বুকভরা আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরবেন।
কারণ ফুটবলের সব সম্পর্ক ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিশ্বাসে, শ্রদ্ধায়, আর নিঃশব্দ আস্থায়।
আর সেই আস্থার সবচেয়ে সুন্দর প্রতীক হয়ে আজও বেঁচে আছে এক হেড। যে হেড একসঙ্গে জন্ম দিয়েছিল এক কোচের কিংবদন্তি, আর এক বঙ্গসন্তানের অমরত্ব।
কিছু গোলের রেশ নব্বই মিনিট পেরিয়েও ফুরোয় না। তারা থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়, সমর্থকদের স্মৃতিতে, আর গুরু-শিষ্যের বন্ধনের অনুচ্চারিত ভাষায়।















