আজকাল ওয়েবডেস্ক: ...ইন মাই রিমেনিং ডেজ ইন ইস্টবেঙ্গল।
মহমেডান স্পোর্টিংকে সাত গোলে বিধ্বস্ত করার পরে ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজোঁ বলছিলেন কথাগুলো।
কিছু কি ইঙ্গিত দিলেন স্প্যানিশ কোচ? সমঝদার কে লিয়ে ইশারাই কাফি!
মহমেডান ম্যাচ জিতে অস্কার ব্রজোঁ সত্যি সত্যি প্রহেলিকা তৈরি করে দিলেন। তাঁর বক্তব্য শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, তিনি নিজেই আর ইস্টবেঙ্গলে থাকতে রাজি নন। লাল-হলুদ তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাড়ালেও তিনি কি থেকে যাবেন? কোটি টাকার প্রশ্ন তৈরি করে দিলেন অস্কার।
কিন্তু তিনি ইস্টবেঙ্গলে থাকতে আর রাজি নন কেন? এই লাল-হলুদে তিনি তো জয়ের বীজমন্ত্র বুনে দিয়েছিলেন। খুঁজে খুঁজে তিনি দলে এনেছেন দারুণ সব ফুটবলারকে। সব মিলিয়ে এক দুর্দান্ত, শক্তিশালী দল গড়ে তুলেছেন অস্কার ব্রজোঁ। যে দল সমর্থকদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। দিনবদলের গান লিখেও অস্কার কেন মরশুম শেষে বিদায় নিতে চাইছেন?
অস্কার অবশ্য এনিয়ে বিশদে কিছু বলেননি। সাংবাদিক বৈঠকে তাঁকে কেউ প্রশ্নও করেননি, ''কেন আপনি বললেন, ইন মাই রিমেনিং ডেজ হিয়ার...?'' প্রশ্নও করেননি
সব শুনে মনে হচ্ছে, অস্কার হয়তো আভাস দিয়ে গেলেন আর ক'দিনই তিনি রয়েছেন ইস্টবেঙ্গলের হট সিটে। নিজের সিদ্ধান্তেই তিনি ছেড়ে দিতে চলেছেন হটসিট। আর এই ক'দিনে তিনি নিজের লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছেন। স্থির করে ফেলেছেন ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ে পাহাড় ডিঙোতে চান।
পাহাড় তো তিনি আগেও ডিঙিয়েছেন। এক ডার্বির সকালে শহর কলকাতায় পা রেখেই তিনি নেমে পড়েছিলেন সন্ধ্যায়। ভয়ডরহীন এক কোচ অস্কার ব্রুজোঁ। অন্য কেউ হলে হয়তো ডাগ আউটে বসতেই চাইতেন না। তাঁর পূর্ববর্তী কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাত সাতটি ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের কফিনে পেরেক পুঁতে দিয়েছিলেন। মানসিক দিক থেকে 'মৃত' সেই দল নিয়ে অস্কার একসময়ে পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। হতাশাচ্ছন্ন সমর্থকদের বুকে বল এনে দিয়েছিলেন। এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে বসুন্ধরা কিংস, নেজমেহকে মাটি ধরিয়েছিল। আর্কাদাগের কাছে হেরে ইস্টবেঙ্গলের জয়ের রথ থামে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে।
এই শুকনো পরিসংখ্যানেই বোঝা যাচ্ছে তিনি নিরামিশ রান্নার মশলা দিয়ে বিরিয়ানি রাঁধতে পারেন।
অস্কার ব্রুজোঁ ইস্টবেঙ্গলকে চোখে চোখ রাখার মন্ত্র শিখিয়েছেন ফুটবলারদের।
ইস্টবেঙ্গলের রিমোট কন্ট্রোল হাতে নেওয়ার আগে ইস্ট-মোহন ম্যাচ মানেই লাল-হলুদের হার হয়ে গিয়েছিল দস্তুর। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকেই অস্কারের দল মোহনবাগানকে বেগ দিয়ে যাচ্ছে মাঠে। ভূভারতের অন্য দলগুলো ভয় পাচ্ছে লাল-হলুদকে।
ডুরান্ড কাপে সবুজ-মেরুনকে ছিটকে দেয় অস্কারের দল। সমর্থকরা নতুন এক ভোরের খোঁজ পায়।
শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল প্রথমে গোল পেলেও ম্যাচ যায় টাইব্রেকারে। জয় গুপ্তার পেনাল্টি মিসে শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কপাল পোড়ে। সুপার কাপে আবার গ্রুপ পর্ব থেকে মোহনবাগানকে ছিটকে দিয়ে শিল্ড ফাইনালের মধুর প্রতিশোধ নেয় অস্কারের দল।
আইএসএলে শুরুটাও ইস্টবেঙ্গল দুর্ধর্ষ ভাবে করেছিল। টানা দুটো ম্যাচ দুটোতেই জয়। কিন্তু হঠাৎই কী যে হল! অস্কারের দল পথভ্রষ্ট হল।
পয়েন্ট নষ্ট হতেই শুরু হয়ে গেল তীব্র সমালোচনা। চারদিকে উঠল 'গেল গেল' রব। যা অতীতেও হয়েছে। আবারও নতুন করে হল। প্রাক্তন ফুটবলাররা অস্কারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। কেউ বললেন, ''কথা বন্ধ করে কাজে মন দিন অস্কার।'' ইস্টবেঙ্গল শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকারের সঙ্গে সংঘাত এসে গেল প্রকাশ্যে। দল, কিছু কিছু ফুটবলার নিয়ে কর্তাদের প্রশ্ন পছন্দ হচ্ছিল না ইমামি-সহ ফুটবলারদের।
অস্কার বিস্ফোরণ ঘটালেন সাংবাদিক বৈঠকে। বললেন, ''দুর্ভাগ্যবশত, ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বিষাক্ত এবং বিভেদমূলক পরিবেশ প্রচার করে চলেছেন এবং দলের বিপর্যয়ে তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করেন। অস্থিরতা তৈরি করার জন্য তাঁরা ক্ষতিকারক ন্যারেটিভ ছড়ান।''
স্প্যানিশ কোচকে জবাব দিয়েছিলেন দেবব্রত সরকার, ''কোচ পেশাদার। আজ আছে কাল নেই।'' সরগরম হয়ে উঠেছিল ময়দান।
অস্কার বুঝেছিলেন প্রাক্তনদের সমালোচনা, সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও অঙ্গুলিহেলনে ওঠা সমালোচনার জবাব দিতে হলে করে যেতে হবে পারফরম্যান্স। জিততে হবে। বদলে গেলেন অস্কার।
তিনি বারংবার বলে আসছিলেন, বিকেল পাঁচটার সময় ম্যাচ ফেলায় তাঁদের সমস্যা হচ্ছে। রমজানের জন্য দলের বেশ কয়েকজন ফুটবলার উপবাসী। ম্যাচের সময়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন তাঁরা। মহমেডান ম্যাচের বল গড়াল সন্ধে সাড়ে সাতটায়। ইস্টবেঙ্গলের জার্সি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দেখা গেল অস্কারই ঠিক। রাকিপ, আনোয়ার, রশিদদের খেলা দেখে মনে হয়েছে তাঁরা পুরোদস্তুর এনার্জি নিয়ে খেলতে নেমেছেন।
যদিও মহমেডান স্পোর্টিংয়ে রক্তাল্পতা রয়েছে। তবুও ইস্টবেঙ্গলের এই সেভেন আপ পারফরম্যান্সকে খাটো চোখে দেখা যাবে না। অস্কার, তাঁর কোচিং স্টাফ, তাঁর ফুটবলাররা মারাত্মক চাপে ছিলেন। ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে বেড়েছিল দূরত্ব। পাশে ছিল কেবল ইমামি। অস্কার এবং তাঁর ফুটবলাররা জানতেন, পারফরম্যান্স তুলে ধরতে না পারলে সমালোচনার ঝড় আরও বাড়বে। এরকম পরিস্থিতিতেই তো পারফরমাররা জ্বলে ওঠেন। অস্কারের দল বিধ্বস্ত করল সাদা-কালো শিবিরকে। আর ম্যাচ জিতে উঠেই লাল-হলুদের স্প্যানিশ কোচের ঘোষণা, আর যে ক'দিন আমি ইস্টবেঙ্গলে আছি...। তাঁর সাংবাদিক বৈঠক শুনে মনে হয়নি তিনি থেকে যেতে চাইছেন লাল-হলুদে। বরং তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছে তিনি আর নিজেই থাকতে চান না। অস্কার ব্রুজোঁকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা তাঁকে বলেন যোদ্ধা। ফাইটার। জিতলে একেবারেই খুশি হন না। জয় তাঁকে স্বস্তি দেয় মাত্র। নিজের ভিতরে জয়ের স্পৃহা আরও বাড়তে থাকে। এর বেশি কিছু নয়। হার একদম হজম করতে পারেন না।
পুরাণে আছে,দেবতাদের কাছ থেকে আগুন এনে মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন প্রমিথিউস। তার মাশুল দিতে হয়েছিল তাঁকে।
অস্কার ব্রুজোঁকেও কি সেই মাশুল গুনতে হচ্ছে? হারতে হারতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া লাল-হলুদের ভিতরে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন আগুন।
এই আগুন ভিতরের এবং বাইরের দুয়েরই। তিনিই শিখিয়েছেন, অন্তরের আগুন যেন কখনও নির্বাপিত না হয়। অদম্য ইচ্ছাশক্তিও যেন বিনষ্ট না হয় কোনওদিন।
চলতি মরশুমে ১৯টি ম্যাচ ইস্টবেঙ্গল। তার মধ্যে ১১টিতে জয় পেয়েছে লাল-হলুদ। চারটি ড্র ও চারটিতে পরাজয়। ৪৬টি গোল করেছে লাল-হলুদ। গোল হজম করেছে ১২টি। ১০টি ক্লিনশিট।
অস্কার ব্রুজোঁ কিন্তু ছাপিয়ে গিয়েছেন অন্য কোচদেরও।
কার্লেস কুয়াদ্রাত ইস্টবেঙ্গলকে এনে দিয়েছিলেন সুপার কাপ। কিন্তু তাঁকেও 'গোল' দিয়েছেন অস্কার।
ইস্টবেঙ্গল কোচ হিসেবে কার্লেস কুয়াদ্রাত ৪০ টি ম্যাচে ১৭টিতে জিতেছিলেন। ড্র করেছিলেন ৭টি। এবং হেরেছিলেন ১৬টিতে।
লাল-হলুদ কোচ হিসেবে অস্কার ৪০টি ম্যাচের মধ্যে ১৯টিতে জিতেছেন। ৯টিতে ড্রয়ের পাশাপাশি, ১২টিতে হার মেনেছেন।
২০২০ সাল থেকে বিচার করলে একমাত্র অস্কারই সবথেকে বেশি ম্যাচ জিতেছেন লেসলি ক্লডিয়াস সরণীর ক্লাবে।
আইএসএলের আরও কয়েকটি ম্যাচ বাকি। অস্কার ব্রুজোঁর কথামতো, 'আর যে ক'দিন ইস্টবেঙ্গলে রয়েছি', সেই ক'দিন আগের মতোই চোখে চোখ রেখে লড়ে যাক লাল-হলুদ। দিনকয়েক আগেও স্টেডিয়ামে উঠেছিল 'গো ব্যাক অস্কার' স্লোগান। মহমেডানকে বিধ্বস্ত করার পরে সেগুলো সব উধাও। সমর্থকরাই জার্সি ওড়ালেন। উড়ল আবির। জ্বলল মশাল।
অস্কারের হাত ধরে এগিয়ে চলুক ইস্টবেঙ্গলের লড়াইয়ের ইতিহাস,পরম্পরা। এক কোচ জিততে চেয়েছিলেন, প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। যে ক'দিন তিনি হট সিটে ছিলেন, ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ম করে পৌঁছে দিয়েছিলেন ফাইনালে, সমর্থকদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। এভাবেই বিচার করা হোক অস্কার ব্রুজোঁকে।
