আর্জেন্টিনা-৩ কেপ ভার্দে-২
(মেসি, মার্টিনেজ, বোর্হেসে-আত্মঘাতী) (দুয়ার্তে, কাবরাল)

আজকাল ওয়েবডেস্ক: 'আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুড়োলো'। ছোটবেলায় ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখে শোনা রূপকথার গল্পের শেষ লাইন। সেই লাইন ধার করেই বলা যায়, বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের রূপকথার নটে গাছটি মুড়োলো। 

তবে বিদায় নিলেও কেপ ভার্দের এই বিশ্বকাপ জার্নি চিরকাল মনে থেকে যাবে। বিশ্বকাপের  শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্র লড়াই, সাহস আর স্বপ্নের এক অনন্য বীরগাথা লিখে গেল। যতদিন ফুটবল থাকবে, ততদিন কেপ ভার্দের এই দুর্দান্ত লড়াইও মনে রাখবে ফুটবলবিশ্ব।

গ্যালারিতে উড়ল পোস্টার, স্মল আইল্যান্ড, বিগ ড্রিমস, নেভার গিভ আপ। আর সেই বার্তাকেই যেন মাঠে বাস্তব রূপ দিলেন ভোজিনহা ও তাঁর সতীর্থরা। পিছিয়ে পড়েও বারবার ফিরে আসার মঙ্গলকাব্য লিখে গেল কেপ ভার্দে। 

একদিকে লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ভোজিনহা। একজন ৩৯। আরেকজন চল্লিশের ছটফটে কিশোর। গোটা ফুটবলবিশ্ব অপেক্ষা করছিল মেসি বনাম ভোজিনহার লড়াই দেখার জন্য।

মাঠে কী দেখা গেল? ব্যক্তিগত লড়াইয়ের পাশাপাশি দল হিসেবে কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য কামব্যাক। কে ভেবেছিল মেসি-মায়ার পরেও ওভাবে ফিরে আসা যায়। কেউ কি ভেবেছিলেন 
 অসাধারণ বল কন্ট্রোল দেখিয়ে গোল করার পরেও মেসিকে বারবার থেমে যেতে হবে কেপ ভার্দের ভোজিনহার দক্ষতার কাছে। মেসির ডান পায়ের শক্তিশালী শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ফিরিয়ে দিলেন তিনি। এমনকি মেসির বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিকও হাত ছুঁইয়ে আটকে দিলেন ভোজিনহা। 

তবুও শেষরক্ষা হয়নি। হয়তো এই ট্র্যাজিক চিত্রনাট্যই কেপ ভার্দের জন্য আগেভাগে লিখে গিয়েছিলেন ফুটবল-দেবতা। অপেক্ষাকৃত অনামী-অখ্যাত দলগুলোর স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত বড় শক্তির সামনে থেমে যায়। কেপ ভার্দের গল্পও শেষ হল সেই চেনা পরিণতিতেই।

কিন্তু স্কোরবোর্ডে হেরে গেলেও হৃদয় জিতে নিল কেপ ভার্দে। ভোজিনহাদের সাহস, লড়াই আর অদম্য মানসিকতা বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর গল্প হয়ে থেকে যাবে। 

ক্ষণে ক্ষণে আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের করে তুলছিল নস্ট্যালজিক। যেন ফিরে দেখা কাতার বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স ফাইনালের রোমাঞ্চ, দমবন্ধ করা, অনিশ্চয়তায় মোড়ানো এক লড়াই।

কেপ ভার্দে এই বিশ্বকাপে সত্যিই চমকে দিয়েছে সবাইকে। তারা ৯০ মিনিটের মধ্যে তিন-তিনটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে রুখে দিয়েছে। একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে হার না মানা মনোভাবের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ড্র। আর আর্জেন্টিনাকেও জয় নিশ্চিত করতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১২০ মিনিট পর্যন্ত। 

কেপ ভার্দের বীরগাথা দেখে বিস্মিত মেসি। তাঁর কোচ লিওনেল স্কালোনি চিন্তিত। চোখেমুখে টেনশন খেলা করছে। গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও ভাবতে বসে গিয়েছেন কীভাবে জয় করা যাবে কেপ ভার্দে। 

রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই আর্জেন্টিনা শিবিরে নেমে এল স্বস্তির নিঃশ্বাস। অবশেষে জেতা হল ‘যুদ্ধ’। কিন্তু অনেক প্রশ্ন যে রয়ে গেল এই জয়ের পরেও। কতদূর যাবে এই নীল-সাদা জার্সিধারীরা? এই দলের জিয়নকাঠি একজনেরই হাতে। লিওনেল মেসি। তিনি থেমে গেলে আর্জেন্টিনা থেমে যাবে। তিনি জিতলে আর্জেন্টিনা জিতবে। 

সেই তিনিই কিন্তু এগিয়ে দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। মাঝমাঠ থেকে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের লম্বা ভাসানো বলকে বাঁ পায়ে অবিশ্বাস্যভাবে বশ মানিয়ে কেপ ভার্দের জালে জড়ান এলএম ১০। তার আগে পর্যন্ত কেপ ভার্দে প্রায় নিখুঁত ফুটবলই খেলছিল। কিন্তু মেসি বিপরীতে থাকলে নিখুঁত হওয়াটাও যে যথেষ্ট নয়। 

কষ্টার্জিত জয়ের রাতে ব্যক্তিগত কীর্তির খাতায়ও নতুন অধ্যায় লিখলেন লিওনেল মেসি। এই ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপে তাঁর ৩০ নম্বর ম্যাচ। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে যা কোনও ফুটবলারের সর্বোচ্চ ম্যাচ। এই পৃথিবী প্রথম দেখল একজন মানুষ বিশ্বকাপে ২০টা গোল করতে পারেন। বিশ্বকাপে টানা আট ম্যাচে গোল। অবিশ্বাস্য। অতিমানবীয় বললেও কম বলা হয় এই কৃতিত্বকে।

তবুও এদিন কেপ ভার্দের ছায়াই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ধরা রইল। ভোজিনহার গ্লাভস জোড়ায় ফুটে উঠছিল নির্ভরতার ভাষা, কাবরালের অবিশ্বাস্য গোল, কেপ ভার্দের লড়াই, লড়াই আর লড়াই দেখার পরে জনপ্রিয় গানের লাইন ধার করে বলাই যায়, শুধু তোমাকেই তোমাকেই স্যালুট করবে তারা দিনরাত।  

মেসির দুরন্ত গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু বিরতির পরই কাহানি মে টুইস্ট। ৫৯ মিনিটে কেপ ভার্দে সমতা ফিরিয়ে আনে। 

রায়ান মেন্দেস বল বাড়ান দুয়ার্তেকে। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের নজর এড়িয়ে ফাঁকা জায়গায় বল পান তিনি। দুয়ার্তের সামনে তখন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। যাঁর লম্বা বল থেকে মেসি গোল করেছিলেন। সেই মার্টিনেজ ভুল করে বসলেন। শট মারার জন্য জায়গা দিয়ে দিলেন দুয়ার্তেকে। ফুটবলে স্পেস আর টাইম একই। দুয়ার্তের শট লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। গোলকিপার এমি মার্টিনেজ শরীর ছুড়ে দিয়েও বলের নাগাল পাননি।  

তার পর মেসিকে বারংবার থামিয়ে দিলেন ভোজিনহা। একবার আর্জেন্টাইন মহানায়কের ডান পায়ের শট কেপ ভার্দের গোলকিপারের শরীরে লাগল, আরেকবার মেসির বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি কিক থামিয়ে দিলেন ভোজিনহা। অবিশ্বাস খেলা করছিল মেসির চোখে। তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন এই ম্যাচ গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে? 

এক্সট্রা টাইমে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ২-১ করে এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে। নীল-সাদা ঢেউ ওঠে গ্যালারিতে। অনেকেই হয়তো জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও আরও কিছু বাকি ছিল। কেপ ভার্দে বিশ্বাস হারায়নি। কাবরালের রামধনুর মতো বাঁক খাওয়ানো শট আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে গেল। স্কোরবোর্ড দেখাচ্ছে ২-২। কাবরাল দৌড়লেন গ্যালারির দিকে। কেপ ভার্দের শ্বাস তখনও পড়ছে। সেন্টার সার্কেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির চোখ বিস্ফারিত। যা দেখছেন, তা কি ঠিক দেখছেন! 

১১১ মিনিটে তৃতীয় বারের জন্য এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। মেসির ফ্রি কিক থেকে রোমেরো হেডে বিষ ঢাললেন। আর্জেন্টাইন তারকার হেড কেপ ভার্দের বোর্হেসের হাতে লেগে জালে জড়ালো। আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল ৩-২-এ। 

এই নাটকীয় মুহূর্তের পরও কি আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ভেবেছিলেন, কেপ ভার্দে আর সমতায় ফিরতে পারবে না? মনে হয়েছিল, এটাই হয়তো ম্যাচের চূড়ান্ত স্কোরলাইন হয়ে থাকবে? আর্জেন্টিনাই শেষ হাসি হাসবে? রেফারির শেষ বাঁশির পরে স্বস্তি ফিরল নীল-সাদার ড্রেসিং রুমে। মেসিদের জন্য শেষ ১৬-য় অপেক্ষা করছে মিশর। 

মায়ামিতে জিতল আর্জেন্টিনা। হেরে গিয়ে বিদায় নিল কেপ ভার্দে। কিন্তু চোখে চোখ রেখে লড়াই, সাহস আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানার গল্প লিখে যেন জিতে গেলেন ভোজিনহারাই। কেপ ভার্দে, তোমাকে স্যালুট করবে তারা দিনরাত।