আজকাল ওয়েবডেস্ক: বর্ধমানে চলা এক ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক এবং একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। টুর্নামেন্ট ঘাসের পিচে হওয়ার কথা, সেখানে খেলানো হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ম্যাটের উপর। শুধু তাই নয়, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য মাঠে কোনও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও নেই। মাঠে খেলোয়াড়রা খাওয়া-দাওয়া করার সময় আশপাশে কুকুর ঘোরাফেরা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, সিএবির অম্বর রায় টুর্নামেন্টের নামে জুনিয়দের খেলা চলছে বেপরোয়াভাবে। 

জেলার প্রাক্তন ক্রিকেটার সুধীরঞ্জন সাউয়ের অভিযোগ মারাত্মক। তিনি জানান, বর্তমানে বর্ধমানে সিএবি অনূর্ধ্ব-১৫ অম্বর রায় টুর্নামেন্টের নামে যে খেলা চলছে, আদৌ এমন কোনও টুর্নামেন্ট সিএবির ক্যালেন্ডারে নেই। তাঁর দাবি, অম্বর রায় ট্রফি মূলত অনূর্ধ্ব -১৩ বিভাগে হয়ে থাকে। আর অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগ লিগ ভিত্তিক হয়। অনূর্ধ্ব-১৫ অম্বর রায় নামে টুর্নামেন্ট সম্পূর্ণ বেনিয়মে চলছে। এই নাম ব্যবহার করে ঠকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আরও অভিযোগ, কোচিং ক্যাম্পের নাম করে প্রতিটি দল বা খেলোয়াড়ের থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, জেলার খেলার সমস্ত খরচ সিএবি বহন করে। তাহলে এই টাকা কারা নিচ্ছে এবং কোন অধিকারে নিচ্ছে, সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন তথা বিডিএসের এই টাকা নেওয়ার কোনও আইনগত অধিকার নেই।

সিএবি গাইডলাইন অনুযায়ী, স্কোরবোর্ড, দু’দিকে সাইড স্ক্রিন এবং মাঠে অ্যাম্বুলেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্ধমানে চলা এই টুর্নামেন্টে তার কোনওটিই মানা হচ্ছে না। তার অভিযোগ, এটা সিএবির খেলা নয়, গলির ক্রিকেটের মতো একপেশে খেলা চলছে। বর্ধমানে বিভিন্ন খেলার একটা ধারাবাহিকতা ছিল। কিন্তু দাবি, রাজনীতির দাপটে সেখানে চরম ডামাডোল। পুরনো খেলোয়াড়রা ক্ষুব্ধ। তাঁদের অভিযোগ, নিয়ম ভাঙাই এখন দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্ধমান জেলা ক্রীড়া সংস্থার। কর্মসমিতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও নির্বাচন হয়নি সংস্থায়। আইন ভেঙে তৈরি হয়েছে ১১ সদস্যের অন্তর্বর্তী কমিটি। বেশিরভাগ জেলায় ক্রিকেট লিগ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, বর্ধমানে এখনও লিগ শুরু হয়নি। কবে হবে তার নিশ্চয়তা নেই। এসবের মধ্যেই অত্যন্ত দায়সারাভাবে এবং নিয়ম ভেঙে শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে সিএবির অনূর্ধ্ব-১৫ জেলাস্তরের ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। রাধারানি স্টেডিয়ামের পিচ এখনও তৈরি হয়নি। সে কারণে রাজনন্দিনী মাঠে ম্যাচের আয়োজন করা হয়। মাঠটি আকারে অত্যন্ত ছোট। পাড়া বা গলি ক্রিকেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে। সিএবি অনুমোদিত কোনও প্রতিযোগিতায় এমন দৃশ্য কল্পনার বাইরে। অভিযোগ, নিয়ম ভেঙেই কৃত্রিম উইকেটে জোর করে ম্যাচ খেলান জেলার কর্তারা। জেলা ক্রীড়াসংস্থার সরকারি কোটায় পাওয়া অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। খেলার প্রয়োজনে সেটির ব্যবহার হয় না বললেই চলে। ম্যাচ শুরুর সময় মাঠে পানীয় জলের ব্যবস্থাও ছিল না। পরে জলের ব্যবস্থা করা হয়। সিএবির কর্তাদেরবিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত বলে মনে করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।

কর্মসমিতিতে ক্রিকেট সচিব পদে থাকা শিবশঙ্কর ঘোষ অন্তর্বর্তী কমিটিতেও রয়েছেন। এই আয়োজন প্রসঙ্গে বলেন, 'যেভাবে ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ নিয়মবিরুদ্ধ। সিএবির প্রতিযোগিতায় হাফ উইকেটে খেলা হচ্ছে ভাবাই যায় না। তাছাড়া টার্ফের বদলে সিন্থেটিক টার্ফ ব্যবহার করাও যায় না। মাঠের আয়তনও অত্যন্ত ছোট। জেলা থেকে ক্রিকেটার তুলে আনার জন্য তৃণমূল স্তরে প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে সিএবি। কিন্তু জেলার কর্তাদের দায়সারা মনোভাবের জন্য সিএবির পরিকল্পনা ব্যর্থ হচ্ছে।' আরটিআই করে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সংস্থার সোসাইটি অ্যাক্টের অধীনে রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। তাঁদের দাবি, কোনও বৈধ কমিটি ছাড়াই এই সংস্থার নামে টুর্নামেন্ট করানো হচ্ছে। অভিযোগ, এর আগে সিএবি থেকে ইন্ডোর ক্রিকেট কোচিং সেন্টারের জন্য ১২-১৩ লক্ষ টাকা পাঠানো হলেও, সেটা আজও তৈরি হয়নি। 

ক্রিকেট সচিব শিবশঙ্কর ঘোষ বলেন, 'কোনও অ্যাসোসিয়েশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে শুধুমাত্র সাব-কমিটির মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট খেলাগুলি পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে চরম নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে। জেলাশাসক নিজেই জানিয়েছেন বর্তমানে কোনও কমিটি বৈধ নয়। অথচ একটি ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।' তিনি আরও জানান, প্রশাসনিক বিভাজন হলেও খেলাধুলার ক্ষেত্রে এখনও বর্ধমান একটাই জেলা। সেখানে আলাদা আলাদা ভাবে টুর্নামেন্ট পরিচালনা করার কোনও যুক্তি নেই।

যদিও এই বিষয়ে বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের অফিসিয়াল স্কোরার দেবাশিস প্রামানিক বলেন, 'সিএবির অধীনেই অম্বর রায় ট্রফি হচ্ছে। ছোটদের খেলা বলেই ম্যাটে খেলা হচ্ছে। এতে ওদের সুবিধা হয়। সিএবি যে নিয়ম পাঠিয়েছে, সেই অনুযায়ীই ম্যাচ পরিচালিত হচ্ছে। মাঠের গঠনের জন্যই কিছু ক্ষেত্রে একপেশে খেলা হচ্ছে।' কোচরাও সবাই সন্তুষ্ট নন। সুরজিৎ দাস বলেন, 'আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। বর্ধমান পিছিয়ে যাচ্ছে। এসব খেলা থেকেই ভবিষ্যতের খেলোয়াড় উঠবে। এটা আরও ভালভাবে করা যেত। এটা পাড়ার টুর্নামেন্ট নয়।' লাগাতার অবহেলা এবং রাজনীতির অভিসারে জেলার খেলা লাটে উঠতে বসেছে। পরিকাঠামো ভেঙে পড়ছে। অনেক পুরনো প্রশিক্ষক বসে যাচ্ছেন। জেলা ক্রীড়াসংস্থায় অ্যাড-হক কমিটি তৈরি করেছেন জেলাশাসক। কিন্তু এভাবে কি খেলার হাল ফেরানো যাবে?প্রশ্ন উঠছে।