আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইস্টবেঙ্গলের মনোতোষ মাঝি। তিনি গোল করেন। স্বস্তি এনে দেন সমর্থকদের মনে। লাল-হলুদের মনোতোষ চাকলাদার। তিনি আবার প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারের পা থেকে বল কেড়ে নেন।
প্রথমজন স্ট্রাইকার। নতুন মরশুমে মেসারার্স ক্লাবকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে কলকাতা লিগ অভিযান শুরু করেছে ইস্টবেঙ্গল। প্রথম গোলটিই মনোতোষ মাঝির। লাল-হলুদের হয়ে আবির্ভাবেই তাঁর গোল।
দ্বিতীয় জন ডিফেন্ডার। নিজের দলের গোলকিপারকে তিনি আশ্বস্ত করেন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে কড়া ট্যাকল করে। একবার এক সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল, ''স্ট্রাইকাররা ম্যাচ জেতান, ডিফেন্ডাররা টুর্নামেন্ট জেতান।''
লেসলি ক্লডিয়াস সরণীর ক্লাবের অবশ্য ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট জিততে স্ট্রাইকার ও ডিফেন্ডার দুই মনোতোষকেই দরকার।
গতবার পর্যন্ত মনোতোষ চাকলাদারের জার্সিতে লেখা থাকত পুরো নাম। এবার তা হয়েছে মনো। বন্ধুমহল, মা-বাবার কাছেও তিনি যে পরিচিত মনো নামেই। লাল-হলুদে ৬৩ নম্বর জার্সির মালিক তিনি।
মনোতোষ মাঝির পিঠে উঠেছে ৫৬ নম্বর জার্সি। দুই মনোতোষকে যাঁরা হাতের তালুর মতো চেনেন, জানেন, তাঁরা আবার তুলে ধরছেন খবরের ভিতরের খবর।
ভবানীপুর থেকে ইস্টবেঙ্গলে আসা মনোতোষ মাঝির পছন্দের জার্সি নম্বর ১৫। আর ময়দানের পোড়খাওয়া মনো ২৮ নম্বর জার্সি পরেই খেলেছেন একাধিক ক্লাবে।
একসময়ে প্রাক্তন ফুটবলার মহেশ গাউলি ২৮ নম্বর জার্সি পরতেন। তাঁকে এবং দীপক মণ্ডলকেই ডিফেন্ডার মনো করেছেন জীবনের ধ্রুবতারা।
পুরুলিয়া থেকে কলকাতা। সার্চ ইঞ্জিন দেখাবে দূরত্বটা কয়েকশো কিলোমিটারের। স্বপ্ন ছুঁতে হলে এই দূরত্বটা তেমন কিছুই নয়!
সেই ২০১৭ সালে কলকাতা আসা। সেখান থেকে উত্তরপাড়ার নেতাজি ব্রিগেডের ক্যাম্প। স্বপ্নগুলো বুনতে বুনতেই মনোতোষ মাঝি এখন ইস্টবেঙ্গলের প্রথম একাদশে।
ব্যান্ডেলের মনোকে নিয়ে আগেও শিরোনাম হয়েছে সংবাদপত্রে। সন্তোষ ট্রফি খেলে সরকারি চাকরি পান তিনি। তার পরে আর রাজ্য দলের হয়ে সন্তোষে যাননি। ডাক এসেছিল। কিন্তু সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর কাছের জনরা বলেন, ''মনো সরকারি চাকরি পেয়ে গিয়েছে। আরেকটা ছেলের চাকরির সুযোগ ও নষ্ট করতে চায় না। তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে সন্তোষ ট্রফি থেকে।'' এখন তাঁর পোস্টিং নবান্নে।
শ্যামনগরের তরুণ সংঘ থেকে শুরু তাঁর ফুটবল পরিক্রমা। এর পরে ইউনাইটেড স্পোর্টস, গোকুলাম, চেন্নাইয়িন, পিয়ারলেস, ডায়মন্ড হারবার, বাংলার হয়ে ঘাম ঝরিয়ে গতবছর থেকে লাল-হলুদ রক্ষণের সেনানী। ইউনাইটেড স্পোর্টসের কর্তা নবাব ভট্টাচার্য বলেন, ''আমাদের থেকেই ওর বড় হয়ে ওঠা।''
স্ট্রাইকার মনোতোষের আবার ইস্টবেঙ্গলে এটাই প্রথম বছর। পিয়ারলেস, ভবানীপুর হয়ে কলকাতার বটবৃক্ষ ক্লাবে তিনি।
দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করে ফুটবলার হওয়ার টানে কলকাতায় চলে আসা। গতবারের সন্তোষ ট্রফিতে ছিলেন তূরীয় মেজাজে। গোল করেছেন ৬টি, অ্যাসিস্ট ৫টি। উত্তরপাড়ার নেতাজি ব্রিগেড ক্যাম্পই তাঁর এখন ঠিকানা। তাঁর মা-বাবা এখন রাজস্থানে। বদলিযোগ্য চাকরি মনোতোষের বাবার।
মনোর বাবা রাজমিস্ত্রি। মা গৃহবধূ। একটা ছোট্ট ঘরেই কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। ওই একরত্তি ঘরেই থাকা-খাওয়া। এবারের পয়লা বৈশাখ নতুন বাড়ি কিনেছে লাল-হলুদের ডিফেন্ডার মনো। ইউনাইটেড স্পোর্টস ক্লাবের সঙ্গে তাঁর আত্মার যোগ। নবাব ভট্টাচার্য তাঁর ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড। বাড়ি কেনার সময়ে যাবতীয় পরামর্শ মনো পেয়েছেন নবাবের কাছ থেকেই। ছেলের জন্য মা-বাবা এখন সুখের মুখ দেখছেন।
গুরু সঞ্জয় সেনের বাধ্য ছাত্র মনোতোষ মাঝি। 'বল মিট করো, ফিনিশিং ভাল করো', গুরুমন্ত্র কানে বাজে স্ট্রাইকারের।
ব্যান্ডেলের পড়শিরা আবার বলেন,''মা-কে নিয়ে আবেগপ্রবণ মনো।'' চোট লাগার ভয়ে ছেলের খেলা দেখেন না মা। ছেলের দল পিছিয়ে পড়লে উঠে পড়েন টিভির সামনে থেকে। একবার সন্তোষ ট্রফি খেলতে গিয়ে মাথা ফেটে গিয়েছিল। মায়ের সে কী বকুনি ছেলেকে, ''তোরই খালি চোট লাগে? আস্তে ধীরে খেলতে পারিস না?'' স্নেহধারা তো নিম্নদিকেই ধাবিত হয়।
লাল-হলুদের দুই মনোতোষের গল্প। একজন গোল করে জেতান। আরেকজন গোল বাঁচিয়ে দলকে রক্ষা করেন।
রক্ষণ থেকে আক্রমণ, ইস্টবেঙ্গলের 'দুই মন'-এর গল্প
















