বুড়োশিব দাশগুপ্ত

গ্রিনল্যান্ড, ইউক্রেন এবং ভেনেজুয়েলার দখল নেওয়ার প্রচেষ্টা আধুনিক ঔপনিবেশিকতার উদাহরণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদ প্রতিরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আধুনিক প্রযুক্তির অপরিহার্য উপাদান ‘বিরল খনিজ’-এর জন্য বিশ্বের নানা দেশের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। 

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দ্বৈত নীতি আরও স্পষ্ট ভাবে নজরে আসছে। মার্কিন বিমানবাহিনীর বিমান মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে অবৈধ মাদক কারবারের অভিযোগে তাঁদের বাসস্থান থেকে তুলে নিয়ে এসে ওয়াশিংটনে বন্দি করে রেখেছে। আমেরিকার নজর বরাবর ভেনেজুয়েলার তেলের ভান্ডার (৩০৩ মিলিয়ন ব্যারেল, সৌদি আরবের ২৬৭ মিলিয়ন ব্যারেল)-এর উপর রয়েছে। ট্রাম্প যা করেছেন, তাঁর পূর্বসূরিরা কেউ সেই সীমা লঙ্ঘন করার সাহস দেখাতে পারেননি। তেলের প্রাকৃতিক ভান্ডারের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় অরিনোকো মাইনিং আর্ক এবং সেরো ইমপ্যাক্টোর মতো দু’টি বিরল খনিজ পদার্থের ভান্ডার রয়েছে। যার বাজার মূল্য শত শত বিলিয়ন ডলার। তাই মাদক ব্যবসার অভিযোগ কেবলই অজুহাত। ভেনেজুয়েলার অসুবিধা হল দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশাল তেল ভান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ উত্তোলন করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অভাব।

অনেক দিক থেকে ইউক্রেন হল রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে স্বাধীন হলেও, রাশিয়া কখনওই ইউক্রেনকে একটি পৃথক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলছে, কারণ রাশিয়া কখনওই ইউক্রেনকে হাতছাড়া করবে না। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেন যে, দুই দেশের মানুষের শিরায় ‘একই রক্ত’ প্রবাহিত হয়। এটি আবারও এক ধরনের দ্বৈত নীতি। ট্রাম্প এই পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার এবং শান্তির আলোচনার আড়ালে বলেন যে, যদি ইউক্রেন তার বিশাল মূল্যবান খনিজ সম্পদ ‘উত্তোলনে’ আমেরিকাকে অংশীদার হতে দিতে রাজি হয়, তবে তিনি ইউক্রেনকে সাহায্য করবেন। ইউক্রেনের বিরল ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের মূল্য নানা প্রতিবেদনে ট্রিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটো ইউক্রেনকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যদিও ইউক্রেন তা অস্বীকার করে। অন্যদিকে, পুতিন দাবি করেন যে ইউক্রেন ন্যাটো সেনাদের উপস্থিতির মাধ্যমে আমেরিকাকে তার দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে।

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বেপরোয়া পদক্ষেপ। তিনি গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশ করতে চান কারণ, তিনি মনে করেন রাশিয়া ও চীন আর্কটিক অঞ্চলের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি। ট্রাম্প শুল্ক হারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলিকে হুমকি দিয়েছেন যে, যদি তারা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর পদক্ষেপে রাজি না হয়, তবে তিনি আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য শুল্ক হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। যদিও দাভোসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এ ট্রাম্প কিছুটা নরম হয়েছিলেন এবং বাণিজ্য শুল্ক আরোপের কথা উল্লেখ করেননি। তবুও তিনি তাঁর গ্রিনল্যান্ডের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ন্যাটো (এটি একটি সামরিক জোট, যেখানে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একসাথে কাজ করে) প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি হয়েছেন। ন্যাটোর অন্যতম একটি নিয়ম হল, যদি ন্যাটোর কোনও সদস্য আক্রান্ত হয়, তবে অন্য সদস্যরা যৌথভাবে তার সমর্থনে এগিয়ে আসবে। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক ডেনমার্ক আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় রাজি হয়েছে। 

গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরল খনিজসম্পন্ন অষ্টম দেশ বলে মনে করা হয়। আর্কটিক অঞ্চলের অংশ এবং দুর্গম হওয়ায় এটি এতদিন আমেরিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর বরফের চাদর অনেকটাই সরে গিয়েছে। এর ফলে আর্কটিকের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজগুলির জন্য সংক্ষিপ্ত বাণিজ্য পথ খুলে দিয়েছে। এই নতুন বাণিজ্য পথগুলি গ্রিনল্যান্ডকে সমুদ্রগামী জাহাজগুলির জন্য একটি অপরিহার্য বিরতিস্থলে পরিণত করেছে। রাশিয়ান ও চীনা ‘আগ্রাসন’ মোকাবিলার অজুহাতে এই নতুন বাণিজ্য পথগুলিতে আমেরিকার প্রবেশ। যা গ্রিনল্যান্ডের ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন বিরল খনিজ সম্পদের প্রতি আমেরিকার লোভকে আড়াল করে দিয়েছে।

সুতরাং বিরল খনিজ পদার্থের জন্য বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধান আরও জোরদার হচ্ছে এবং ভারতও এর বাইরে নয়। বিরল খনিজ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যেই আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। আরাবল্লি পাহাড় বিতর্কটি কেবল শুরু মাত্র।