বুড়োশিব দাশগুপ্ত
কলকাতা থেকে শুরু হওয়া মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর ভারত সফরের সঙ্গে ২০১২ সালে প্রাক্তন মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিনটনের সফরের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। তাঁরা দু’জনেই পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছিলেন এমন এক সময়ে যখন রাজ্যে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছিল– ২০১১ সালে বাম থেকে তৃণমূলের হাতে এবং ২০২৬ সালে তৃণমূল থেকে বিজেপির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল। দৃশ্যত, তাঁরা দু’জনেই মাদার টেরেসার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। কিন্তু সমালোচকরা এর নেপথ্যে আরও গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ রয়েছে, এই সন্দেহ কখনওই যে করেননি তা বলা যায় না। রাজ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশায় কেউ কেউ এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। কিন্তু এই ধরনের আশা খুব কমই বাস্তবায়িত হয়। ২০১১ সালের পরেও তা হয়নি। এই বছরের পরিবর্তনের পরেও আমরা এখনও কিছু দেখতে পাইনি। অন্যরা এই সফরকে হতাশাজনক বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, আগের সফর ছিল কমিউনিজমের অবসান দেখার জন্য এবং বর্তমানে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিভাজনের তথাকথিত আন্দোলনের পরিণতি দেখার জন্য। হাসিনা তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির নেপথ্যে আমেরিকার ‘হাত’ দেখেছিলেন। ভারত সন্দেহ করছে যে ‘পশ্চিম’ বাংলাকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অনেকে মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে জেতার জন্য বিজেপির মরিয়া চেষ্টা রাজ্যের ভিতরে ও বাইরে এই বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা রোদ করার জন্যই। ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির উপর আমেরিকার নজর রয়েছে এবং চীনেরও।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের তিস্তা জলচুক্তি নিয়ে বিবাদের সমাধানের পথও সহজ করে দেবে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রতিরোধের কারণে যা অমীমাংসিত ছিল। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তিস্তা জল সমস্যার সমাধানে চীনের সাহায্য চেয়েছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগেজনক। ভারত-বাংলাদেশের উচিত দ্বিপাক্ষিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করা। এই বিষয়ে চীনকে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া মানে বাংলাদেশকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়া। ফারাক্কা জলবণ্টন চুক্তিটিও এই বছরের শেষে নবীকরণ হওয়ার কথা। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমরা বাংলাদেশকে ভারতেবিদ্বেষী করে তোলার ঝুঁকি নিতে পারি না। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বছরে ৭০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য করে। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে আরও ৭০০ কোটি ডলারের ‘অসংগঠিত বাণিজ্য’ হয়। ভারতের উচিত কঠোর সীমান্ত নজরদারি এবং সীমান্ত বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করার মাধ্যমে এই বাণিজ্যকে বৈধ বাণিজ্যে রূপান্তরিত করা। অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করার চেয়েও, সীমান্ত বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং কঠোর নজরদারি আমাদের কোষাগারকে উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ করবে।
শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন’স নেক’ নামে পরিচিত এই ভূখণ্ডটি পশ্চিমবঙ্গে ভারতের জন্য আরও একটি উদ্বেগের কারণ। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝে অবস্থিত ভারতের এই ভূখণ্ডটি কখনও কখনও মাত্র ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত সংকীর্ণ। বাংলাদেশে অস্থিরতার সময় বিদ্রোহীরা এই ভূখণ্ড দিয়ে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করে নেপালে প্রবেশ করার হুমকি দিয়েছিল। এমনকি বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন মুখ্য উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসও উত্তর-পূর্বের সমগ্র ‘স্থলবেষ্টিত’ রাজ্যগুলির জন্য চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে সমুদ্রপথ খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন– যা একটি বিভাজনমূলক পদক্ষেপের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
রাজ্যে অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত জুড়ে অবৈধ গবাদি পশু ব্যবসা এবং অসম্পূর্ণ সীমান্ত বেড়ার মতো স্থানীয় নির্বাচনী বিষয়গুলি এই আন্তর্জাতিক হুমকিগুলিকে আরও উস্কে দিচ্ছিল। ভারত মহাসাগর-দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে ভারত। মার্কো রুবিওর ভারত সফরের মধ্যে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোয়াড বৈঠকও ছিল, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের প্রতিনিধিরা এই অঞ্চলে বৃহত্তর সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু এই চারটি দেশের মনেই চীনের সম্প্রসারণবাদের আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ হল ভারতকে ঘিরে ফেলার একটি কৌশল, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রয়োগ করা হয়। ভারত ‘ডায়মন্ড নেকলেস’ নামে একটি পাল্টা কৌশল তৈরি করেছে। প্রাচ্যের এই সামরিক কৌশলগুলিতে কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা। তাই দিল্লি এবার রাজ্য নির্বাচনের মাধ্যমে কলকাতাকে জয় করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। বেশ কয়েকবারের ব্যর্থতার পর অবশেষে তারা সফল হয়েছে।















