প্রতীক্ষা ঘোষ
‘সেই এক বিনোদিনী’। ইতিহাস যাঁকে বারবার একরৈখিকভাবে, পুরুষের দৃষ্টিতে, নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এসেছে। যাঁর ইতিহাস নিয়ে মানুষ চর্চা করতে শুরু করলে, ব্যক্তিজীবনে কটা ‘বাবু’ এলেন, কী কী উপঢৌকন দিলেন, কতখানি গভীর দুঃখ ছেপে দিলেন তাঁর হৃদয়ে, কটা টুকরোতে ভাঙলেন তাঁর বিশ্বাস, এইটাই যেন বিনোদিনী। এগুলো জানলেই যেন জানা হয়ে গেল পুরো বিনোদিনীকে। রামকৃষ্ণের কাছ থেকে পাওয়া আশীর্বাদের খবর বাংলায় ছড়িয়ে পড়লে পরে বাংলার উচ্চবিত্ত বাবুদের, "ভাবটা এমন, যেন বিনোদিনী বেশ্যা, তবে একটু ভাল বেশ্যা।"
সুরজিৎ ব্যানার্জির লেখা, নাট্যরঙ্গর প্রযোজনায় ‘সেই এক বিনোদিনী’, নাটকটার শুরুটাই হয় খুব সচেতনভাবে। কোনও গ্র্যান্ড সেটে নয়, কোনও ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ দিয়ে নয়; বরং একটি রিহার্সাল রুমে। একটি নাটক তৈরি হচ্ছে, যে নাটকের বিষয় বিনোদিনীর অনুচ্চারিত শেষ জীবন। কিন্তু নামভূমিকায় যিনি অভিনয় করবেন, তিনি অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতিই যেন প্রতীকী—ইতিহাসে যেভাবে বিনোদিনীকে বারবার অনুপস্থিত করা হয়েছে, নিজের গল্প বলার সুযোগ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। ঠিক এই শূন্যতার মধ্যেই প্রবেশ ঘটে ‘আসল’ বিনোদিনীর আত্মার। এই প্রবেশ কোন ভৌতিক আতঙ্ক ছড়ায় না। বরং আতঙ্ক ছড়ায় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার। যে সত্যকে মেয়ে ভুলিয়ে পাশ ফিরিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়, তার মুখোমুখি হতে গেলে আতঙ্ক, ছায়ার মতো জাপ্টে ধরে। যে সত্য জানে যে নটী-দাসী-বেশ্যা নয়, বিনোদিনীর পরিচয় অভিনেত্রী হিসাবে। যে সত্য জানে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে কতখানি অভিমানে তিনি অভিনয় থেকে অবসর নেন। জানে, কেন অবসরের দিনগুলো কাটাতে তিনি স্টার থিয়েটরের পাশেই বাড়ি নেন। সেই সত্য, যা সমাজে পিতৃতন্ত্রকে বারবার প্রশ্ন করে। প্রশ্ন করে বাবুদের গল্পগুলো কি বিনোদিনীর শিল্পীসত্তাকে ধারণ করতে পারে?
মঞ্চে গল্প যখন আলোয় আলোয় এগিয়ে চলে, তখন উপস্থিত হন, নাম ভুমিকার অভিনেত্রী বিনোদিনী। আসল বিনোদিনীর কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়, স্টার থিয়েটর বদলে বিনোদিনী থিয়েটর হল, আপনার কেমন লাগছে? আসলজনের চোখমুখ বদলে গেল কেমন! কী ভীষণ ক্লান্তি গিলে ফেলল চোখ দুটোকে।
একালের নামভূমিকার অভিনেত্রীর সংলাপে তখন ফুটে ওঠে আসলজনের মনের অভিব্যক্তি। “যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে নিয়ে”। শঙ্খ ঘোষের যমুনাবতী কবিতার এই একটি বাক্যে যেন গোটা ইতিহাসকে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। সেই ইতিহাসকে, যাকে অনাদরে কবর দিয়েছে পিতৃতন্ত্রের চোখরাঙানি। বিনোদিনীর সমকালীন, বা তারপরের অনেক অভিনেত্রীকেই তো ইতিহাস কেমন নেপথলিন দিয়ে তাকে তুলে দিয়েছে সেই কবেই। কিন্তু বিনোদিনী? তিনি অপমানের, লাঞ্ছনার, অস্বীকৃতির যে বারুদ বুকে আগলে রেখে জীবন ঢেলে মশাল জ্বেলেছেন, তাকে তুলে রাখবে এমন আলমারি কই?
নাটকের গঠন ক্রমাগত স্তর খুলতে থাকে। একসময় ঢুকে পড়েন শেক্সপিয়র—বিশ্বনাট্যের প্রতীক হিসেবে। যেন বলা হয়, বিনোদিনী কোনও প্রাদেশিক ঘটনা নন; তিনি বৈশ্বিক নাট্যপরম্পরার অংশ। তাঁর অভিনয়, তাঁর শ্রম, তাঁর শিল্পচেতনা—সবই আন্তর্জাতিক নাট্য ঐতিহ্যের সঙ্গে তুলনীয়।
তারাসুন্দরীও আসেন নাটকে। আসে তাঁর সংলাপে উঠে আসে নারীর ভালবাসার ভাষা কীভাবে সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রিত সেই আক্ষেপ। নিজের জীবনের সঙ্গে যখন বিনোদিনীর জীবনকে জুড়ে নিতে শুরু করলেন, তখন এক জায়গায় বলে উঠলেন, “আমার প্রেমিক (কিছুটা থেমে, তাচ্ছিল্য এবং ব্যথা মেশানো হাসি হেসে) ওহ! আমাদের তো আবার প্রেমিক হয় না। (দীর্ঘশ্বাসের সাথে) বাবু…” যখন তারাসুন্দরী ও বিনোদিনীর সংলাপে সংলাপে ব্যাখ্যায়িত হয় “চৈতন্য হোক” শুব্দদ্বয়ের, তখন যেন তা এই একপেশে ইতিহাসকেই চূড়ান্ত বলে বিশ্বাস করাতে চাওয়া পিতৃতান্ত্রিক সমাজের উদ্দেশ্যেই বলা হয়।
নাটকের পরতে পরতে মিশে যান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মিশে যান লালন ফকির কিম্বা শেক্সপিয়র। আমাদের কাউকেই মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। ওঁরা সকলেই শিল্পী, শিল্পেই তাঁদের পরিচয়, মুক্তি, চিত্তের শুদ্ধিকরণ। কিন্তু কেন জানি না, একমাত্র বিনোদিনীকেই আমরা ‘দাসী’ ভাবি। যখন তাঁকে বলা হয় আজকের প্রজন্ম তাঁকে ভারী সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে, তখন তিনি তাচ্ছিল্য ভরে বলেন, “শ্রদ্ধা! হুঁ! একজনকেও দেখেছিস আমার ছবি ঘরে টাঙিয়ে রাখতে?” এই নাটক বার বার মনে করিয়ে দেয় সেই সকল মঞ্চাভিনেত্রীদের, যাঁরা আজ ইতিহাসের একচোখামিতে দাসী কিম্বা নটী হয়ে গিয়েছেন, “অভিনেত্রী” হননি।
বিনোদিনীকে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন, অনিন্দিতা ব্যানার্জি। এই নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনিই। তবে বিনোদিনী চরিত্রে, মঞ্চে তিনি অসামান্য। কী ব্যক্তিত্ব! অভিনেত্রীর ন্যায্য দাবী এবং আহত শিল্পীসত্ত্বা, সেসবই তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট। তারাসুন্দরীর ভূমিকায় দেবপ্রিয়া ব্যানার্জিও যেন, সমস্ত ইতিহাসের ধামাচাপা অভিনেত্রীদের মুখ হয়ে উঠেছেন। ক্ষেত্রমণির ভূমিকায় থাকা চলন্তিকা গঙ্গোপাধ্যায় দক্ষ গলায় যখনই গান ধরছেন, কখনও ফকিরি, কখনও রবি ঠাকুর; তা পরিপূরক হয়ে উঠেছে সুবীর সান্যাল এর সঙ্গীত নির্দেশনার। বিলু দত্তর মঞ্চ সাজানোর মধ্যেও সচেতনতা চোখে পড়েছে। বেশ কয়েকটি স্তরে ভাগ করে নেওয়া মঞ্চে, ফুটে ওঠে নিঃসঙ্গতা এবং নিজের সঙ্গে বসবাসের গভীর দর্শন। এ বাদে, যাঁদের নাম না করলে, নাটকটি ফাঁকা ফাঁকা হয়ে যায়, তাঁরা হলেন, রূপসজ্জায় থাকা অলোক দেবনাথ, আলো পরিচালক দীপঙ্কর দে এবং আলো নিয়ন্ত্রক সমর পাড়ুই; সঙ্গে তবলায় সৌদীপ চক্রবর্তী ও বেহালায় গৌরব মুখার্জি। এঁদের সকলের মিলিত চেষ্টাতেই নাটকে বিনোদিনী ও বিনোদিনীতে নাটক বেঁচে থাকে, নটী-দাসী-বেশ্যা র বাইরে, অভিনেত্রী হিসাবে।
