অভি চক্রবর্তী 



ভিনসেন্টের নাম ছেলেবেলায় অন্য অনেকের মতো শুনে থাকলেও তার কবলে পড়ে যাই, বলা ভাল খপ্পরে এসে পড়ি লকডাউনের খানিক আগে আগেই। সাহিত্যের ছাত্র না হওয়ায় আমার সুবিধে হল এই যে সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে আমার তথাকথিত কোনও গন্ডি বা সিলেবাস নেই। আমার পড়ার এক্তিয়ার স্বাধীন এবং ভাললাগা বা কেজো প্রয়োজনের উপরেই নির্ভরশীল।

একটি থিয়েটারে স্টারি নাইটের অ‍্যানিমেটেড প্যাটার্নটা ব্যবহার করবার উদ্দ্যেশ্যেই ভিনসেন্টের মধ্যে প্রবেশ এবং একপ্রকার গ্রস্ত হয়ে পড়া। একের পর এক তার জীবনী, ফিল্ম, চিঠি চাপাটি পড়তে পড়তে আমি সেইসব বেলা- অবেলা- কালবেলা পেরিয়ে যেতাম অনায়াসেই। পেরিয়ে যেতাম প্যারিস থেকে আর্লস। কয়লা খনি থেকে সেন্ট রেমির উন্মাদাগার। উন্মাদ হয়ে উঠছিলাম ভিতরে ভিতরে। কিছু একটা করতেই হতো আমায়, সেই কিছু একটা করতে হবার যে অনিবার্য তাড়না সেখান থেকেই প্রথম লিখে ফেলি, 'ভিনসেন্টের ধূমাবতী' নামক একটি নীরিক্ষামূলক উপন্যাস। আসলে ভিনসেন্টের জীবন সায়াহ্নে কাকের উপদ্রবের সঙ্গে মেলাতে চেয়েছিলাম এক ভারতীয় কর্কশ এবং ভয়াল কাকবাহনা দেবীর বিভিন্ন অশুভ চিহ্নকে। সে আলোচনার বিষয় এটা নয়। কিন্তু আলোচ্য এই যে, এইসব লেখালিখির অন্দরে প্রবেশ করতে গিয়ে আমি পুনর্বার তছনছ হয়ে গেলাম, এই দিব্যোন্মাদ এবং বিষাদমগ্ন মানুষটির দ্বারা। যা হোক উপন্যাস প্রকাশের পর যখন সামান্য স্থিত হয়েছি ভিতরে ভিতরে হঠাৎ প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক মণীশ মিত্র আমাকে জানান, তিনি 'ভিনসেন্টের মৃত্যু' নামক একটি থিয়েটার করছেন যার অনেকাংশই আমার উপন্যাসের আধারে লিখিত। ইতিমধ্যেই মণীশ দা আমার এই উপন্যাস সম্পর্কে তার ভাললাগা প্রকাশ করেছেন বারবার। প্রকাশ্যে। যা হোক সেই থিয়েটার দ্যাখার অভিজ্ঞতা আমি পূর্বেই জানিয়েছি, প্রকাশ্যেই। তাই এ নিয়েও অধিকোচ্চারণ থেকে নিজেকে সংবরণ করলাম। 

ভেবেছিলাম, আমার জীবনের ভিনসেন্ট অধ্যায়ের নিষ্পত্তি ঘটল বোধহয়। ও বাবা! কোথায় কী! উপন্যাসেরই একটা ছোট্ট অংশ ছিল আলুভোজীদের উপাখ্যান নামে। সেই অংশটা খানিক মনোলগের ঢংয়ে লেখা এবং ঈষৎ পরিমার্জন করে আমি আমার 'মনোলগময়' বইয়ে এই লেখাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। লেখাটি কোনও এক নিভুনিভু সন্ধ্যায় শুনিয়েছিলাম বন্ধুবর নির্দেশক সুদীপ্ত দত্তকে। সুদীপ্ত এটির অপূর্ব এক মঞ্চরূপ হাজির করলেন, অভিভূত আমি আবার সেই টানেলে ঢুকে পড়লাম। এই টানেল মুখর। এই টানেলের নাম 'ভিনসেন্ট'। কারণ ততদিনে আমাকে ভ্রাতৃপ্রতিম শরণ্য দে অনুরোধ করেছেন ভিনসেন্ট নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ টেক্সট লিখতে এবং আমি মহা-আহ্লাদিত হয়ে সে কাজে লেগে পড়েছি, অবশেষে গতবছরের শেষে ৪ ডিসেম্বর, আকাদেমিতে মঞ্চস্থ হল এই থিয়েটার। 

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, থিয়েটারটি লিখতে গিয়ে আমার অত্যন্ত বেগ পেতে হয়েছিল, কারণ শুধুমাত্র একটি জীবনকে নাট্যে দেখাবার কোনও কারণ আমি খুঁজে পাই না যতোক্ষণ না সেই জীবনকে কেন্দ্র করে যে যাপনের শোভাযাত্রা তথা সংসৃতি আমাকে বিচলিত বা তাড়িত না করে। ভিনসেন্টের জীবনের মজাই এখানে, এক আর্টিস্ট তাঁর জীবনভোর স্থিত হতে চেয়েছেন, আবার পালাতে বাধ্য হয়েছেন সেই স্থিতি থেকে।  চেয়েছেন প্রেম, চেয়েছেন সংসার, চেয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়, ব্যাস চুরমার হয়ে গিয়েছে সব। এ এমন এক অত্যাশ্চর্য মানুষ যিনি সত্যিই 

আজীবন হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগিয়ে গেছেন এবং সেই বেদনা বয়ে গেছে এক শতক থেকে আরেক শতকে। কালিক সময়চিহ্নের বজ্র আটুনিতে তাকে বেঁধে রাখা যায়নি, যাবেও না। তিনি প্রবাহিত হয়েছেন অনায়াসে। তাই শরণ্য যখন ভিনসেন্ট করেন, ভিনসেন্টের চরিত্র করেন তখন শরণ্যর এতদিনের যে অভিনয়- প্রদর্শনের নিজস্ব ভাবনা এবং তা প্রকাশের শৈলী তা ভাঙচুর হয়ে যায়, ভাঙচুর হয়ে যায় হয়ত শরণ্যের অজ্ঞাতেই। আর কে না জানে, 'ক্রিয়েটিভিটি আনকনশাস'। আমার লেখায় পড়ন্ত বিকেলের স্মৃতিচারণ থেকে নাটক শুরু হয়, তারপর একের পর এক দৃশ্য আসে যেখানে দর্শক পড়ে ফেলে একটা জীবনজোড়া বেদনার কথা, একটা জীবনজোড়া ছুটের কথা, একটা জীবনজোড়া অতৃপ্তির কথা। শরণ্যর থিয়েটার এই সবকটি মানব জীবনের এক্সট্রিমিস্ট অবস্থানকে একটা অনবদ্য গতি দিয়েছে, বারংবার লোকেল চেঞ্জ করেছে সামান্য আসবাব এবং প্রপসের বুদ্ধিদীপ্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে। অন্ধকার এবং আলোর অনবদ্য রঙীন ক্যানভাস তৈরি করে দিয়েছেন আমার আরেক ভ্রাতৃপ্রতিম আলোক পরিকল্পক সৌমেন চক্রবর্তী, আর দৃশ্য উদ্ভাবন এবং তার প্রকাশে তরুণ প্রতিভা পাঞ্চজন্যর আবহের কাজ ঈর্ষণীয়। এইরকম একটি জীবন অভিমুখী টেক্সটকে, এই অসহায় মার খেতে খেতে একা হয়ে যাওয়া জীবনকে সাংঙ্গীতিক শূন্যতা ও প্রাচুর্যে ভরিয়ে দিয়েছেন পাঞ্চজন্য। লাইভ সঙ্গীত ও আবহের ব্যবহার ভিনসেন্টের জীবনের মতোই তাই এ নাট্যে সদা জাগরুক এক সঞ্চারণশীল চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এটি আমার কাছে অভিনব না হলেও চমকপ্রদ যা টেক্সটকে থিয়েটার করে তুলতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়েছে আমার। এ ভাবেই ভিনসেন্টের যাত্রা চলছে টেন্থ প্ল্যানেটের শিল্পীদের হাত ধরে, বলা বাহুল্য শরণ্য আস্থা রেখেছে ওর দলীয় বৃত্তের সৎ এবং নিষ্ঠ অভিনেতাদের প্রতি। সঙ্গে জুড়ে নিয়েছেন শশী গুহ, আরাত্রিক-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাদের। বিশেষত আরাত্রিকের থিও-তো বারবার আমাদের অশ্রুসিক্ত করে তুলছিল আর উল্লেখ করতে হয় কল্পনা বড়ুয়া কৃত ক্রিস্টিন তথা সিয়েন। অনবদ্য বললে ভুল বলা হবে, বলা ভাল অপূর্ব। বাইরের ঝলমলে সিয়েনের অন্তর্গত বেদনা আবার স্বাধীন মনের নিরাপদ হওয়ার বাসনার যে দ্বন্দ্ব-কল্পনা তার স্বল্প চরিত্রে গড়ে তুলেছেন তা আশাকরি আমাদের মনে থেকে যাবে। মনে থেকে যাবে অনেকদিন। 

আমার শুধু মনে হয়েছে, সূর্যমুখী, তারাভরা আকাশ এবং কাকের অনুষঙ্গ আরেকটু আসতে পারত এই থিয়েটারে কিন্তু প্রতিটি নির্দেশক আলাদা মানুষ, আলাদা তাদের ভাবনা-চিন্তা তাই আমার লেখা হলেও এখানে এই থিয়েটার এখন শরণ্যের, এই থিয়েটার এখন টেন্থ প্ল্যানেটের এবং এই থিয়েটার এখন অবশ্যই ভিনসেন্টের। আসুন এই শীতে আমাদের এক বিষন্ন তারাভরা আকাশের নীচে দ্যাখা হোক। 

হারুকি মুরাকামির উপন্যাস নিয়ে কথা বলবার ধৃষ্টতা আমার নেই। লডাউনের সময় যখন কবি বন্ধু, অগ্রজ প্রতিম সুদীপ বসুর অনুবাদে মুরাকামির মিনি উপন্যাস 'আজব লাইব্রেরি' হাতে আসে এবং পড়ি তা আমাকে চূড়ান্ত আলোড়িত করেছিল। জ্ঞান কীভাবে একটা ক্ষমতাতন্ত্রের অভিমুখ হয়ে উঠতে পারে এবং সেই অভিমুখকে জাদু বাস্তবতা দিয়ে প্রতিহত করবার গল্প বলেছেন মুরাকামি তার এই ছোট্ট উপন্যাসে। নাট্যায়ন সম্পূর্ণ করবার পর করছি করব বলে অনেকদিনই পান্ডুলিপি একলা পড়েছিল। নীরবে। বারাসত কাল্পিকের দেবু তথা দেবব্রত ব্যানার্জির সঙ্গে আমার পরিচয় অনেককালের। মার্চের এক সন্ধ্যায় দেবুকে এই নাটক শোনাই আমি, আমারই দলে। দেবু তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় এই থিয়েটার করবার ব্যাপারে। তারপর গত বছর জুলাইয়ে, অশোকনগর শহীদসদনে আমি এই থিয়েটারের ক্লোজ ডোর দেখি এবং পরপর উপর্যপুরী আরো দু'টি অভিনয় প্রত্যক্ষ করি। 

এই টেক্সটে পরতে পরতে জাদু বাস্তবতা বিছিয়ে আছে, দেবব্রত তাকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করেছে। বিশেষত করিডর থেকে লাইব্রেরির অন্দরে যাওয়া, তুরস্কর প্রাচীন জনজীবন, শ্মশান, নক্ষত্রখচিত আকাশ, অমাবস্যার আকাশকে যেভাবে নাট্যমঞ্চে এনেছেন দেবব্রত, এনেছেন আলো- আবহ- মঞ্চের চুড়ান্ত তালমিলের মধ্যে দিয়ে তারজন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয় কারণ সম্পূর্ণটাই আমার কাছে ফ্রেশ একটা যাত্রা মনে হয়েছে। পাপেটের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নাটক জুড়ে একটি থ্রিলারের আবহ বজায় থেকেছে আবার মাঝেমাঝেই জাদুবাস্তবতা জেগে ইঠেছে দারুণ কিছু কম্পোজিশান, পোশাকে, আলো এবং আবহের নিদারুণ সংশ্লেষে। সর্বক্ষণ গোটা নাটক চলিষ্ণু থেকেছে। ফলত অভিনেতাদের সতর্ক এবং সচকিত থাকতে হয়ে সর্বক্ষণ। 

ইদানীং এক নাট্যবিদ বলে বেড়াচ্ছেন মফস্বলে নাকি গল্প অভিমুখী, সরল নাটক চান  দর্শকেরা। প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেল থিয়েটারে। সোশাল মিডিয়ার এই সুনামির পর গোটা বিশ্বই যেখানে গ্লোবাল ভিলেজ সেখানে এই জাতীয় কথার পিছনে যে লুকোনো এজেন্ডা আছে বা থাকে সে কথা হলফ করে বলতেই পারি। এবং স্মরণ করতে পারি এই মফস্বল থেকেই 'কেননা মানুষ', 'দানো', 'যখন যুদ্ধ', 'পোস্টমর্টেম', 'খোয়াব', 'শনি', 'অহল্যা'-এর মতো এমনসব থিয়েটার অভিনয় হয়েছে যেখানে তথাকথিত গল্পের কোনও প্রয়োজন হয়নি। বা গল্প থাকলেও তাকে শুধুমাত্র গলার অনুপ্রেরণায় চিৎকার করে বলে যেতে হয়নি। সীমিত সামর্থে টোটাল থিয়েটার হয়ে উঠেছে এই কাজগুলি। আমি নিশ্চিত বারাসাত কাল্পিকও সে পথেই যাত্রা করে চলেছে। আমার আপনার পাশে থাকা না থাকায় এই যাত্রায় জতিচিহ্ন পড়বার কোনও সম্ভাবনা নেই।