উদ্দালক

 

বাংলা ছবির নানা দিক উন্মোচিত হচ্ছে এই বছর জুড়ে। ভাল-মন্দ বিচার দর্শকের বিষয়, কিন্তু নতুন কিছু হচ্ছে, গবেষণা হচ্ছে নতুন নতুন, সেগুলোর বাণিজ্যিক মুক্তিও হচ্ছে। 'ডিপ ফ্রিজ' দেখতে দেখতে সেই কথাটা আরও বেশি করে মনে হচ্ছিল। অর্জুন দত্ত পরিচালিত এই ছবিটি ইতিমধ্যে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। সেই কারণে মুক্তির আগেই তা নিয়ে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। ছবি মুক্তি সেই আলোচনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। কারণ, জাতীয় পুরস্কারের গরিমা শুধু নয়, এই ছবি একক পরিচয়েও সেই মান রাখল সাফল্যের সঙ্গে। 

মধ্যবিত্ত জীবনের কতগুলো চেনা সঙ্কট, সম্পর্কের জটিলতা ও তার ভিত্তিতে নারী-পুরুষের অন্তরের অন্ধকার-আলোর যে নিরন্তর খেলা চলে, সেই খেলা নিয়ে অর্জুনের আশ্চর্য ছবি নির্মাণ। সাহিত্যের দিকে ফিরে তাকালে কখনও জগদীশ গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র বা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়দের লেখায় সদ্যগঠিত কলকাতা শহর ও আধুনিকতার আঁচলে ঢাকা গ্রাম-শহরের সম্পর্কের বৈচিত্র্য ধরা পড়ে। সেখানে প্রেম এসেছে শুদ্ধ-অশুদ্ধের বেড়া ভেঙে, নীতি আর নীতিহীনতার গণ্ডি অতিক্রম করে। এই ছবিতেও তেমনই ধরা দিয়েছেন দু’জন মানুষ, প্রবৃত্তির গণ্ডিতে, স্বাভাবিকতার আগলে। সেই কারণেই এই ছবি নতুন লেগেছে, ফ্রেশ লেগেছে। কারণ, প্রচলিত ধারনার বাইরে গিয়ে যা স্বাভাবিক করে ভেবেছে এই ছবি, তা অনেকেই ভাবতে পারেন না।

অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়, তনুশ্রী চক্রবর্তী, অনুরাধা মুখোপাধ্যায়রা এই ছবিতে অনন্য অভিনয় করেছেন। এরা প্রত্যেকেই বাণিজ্যিক ছবির বাইরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন বারংবার। আবির তো বটেই, পাশাপাশি তনুশ্রী, অনুরাধাও এখন বাংলা ছবি, ওয়েব সিরিজের জগতে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। বাংলা ছবির গবেষণার প্রতিটি ধাপে এরা নানাভাবে, নানা উল্লেখযোগ্য চরিত্রে নিজেদের মেলে ধরেছেন, আর সেই আলো এসে পড়েছে দর্শকদের কাছে। সেই কারণেই আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় এঁদের সকলেরই। তবে শুধু এরাই নয়, স্ক্রিন টাইম কম পেয়েও কিন্তু মাতিয়ে দিয়েছেন দেবযানী চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়দের মতো বর্ষীয়ান অভিনেতারা। তাঁরাও নিঃসন্দেহে এই ছবির সম্পদ।

ছবির গল্প ও সংলাপ লিখেছেন পরিচালক অর্জুন দত্ত নিজে। পাশাপাশি চিত্রনাট্য লেখার কাজ করেছেন আত্মদীপ ভট্টাচার্য, আশির্বাদ মৈত্র (আইএমডিবি ভিত্তিক তথ্য)। সংলাপ লিখেছেন আশির্বাদ মৈত্র। এই নামগুলো উল্লেখ করা কেন, কারণ, এরা প্রত্যেকে নিজেদের কাজে অত্যন্ত যত্নের পরিচয় দিয়েছেন। আসলে এমন ছবি, যে ছবির মূল কথাটাই হল মূল্যবোধ, সম্পর্ক ও তার আলো অন্ধকার নিয়ে সংলাপ, সেখানে এদের ভূমিকা অন্যতম হয়ে উঠতে বাধ্য। এরা প্রতিটি কথা যত্নে, মায়ায় ও গভীরতায় ভরিয়ে তুলতে পেরেছেন।

পরিচালক অর্জুন দত্তর অব্যক্ত সমালোচকদের মন কেড়েছিল। প্রেসিডেন্সির ছাত্র অর্জুনের প্রতিটি ছবিতেই সম্পর্কের এই স্তরবিন্যাসের দিকে গভীর মনযোগ চোখে পড়ে। সেই ছবিতে ছিলেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়, অসামান্য তাঁর অভিনয়। অর্জুনের এই ছবিতেও সেই মায়া বিদ্যমান। যে কালারটোন অর্জুন ব্যবহার করেছেন এই ছবি জুড়ে, তাতে মনেই হচ্ছে না এটা এই শহর বা শহরতলির কোনও অংশ। যদিও ভূগোলটা কোথাও স্পষ্ট করেননি পরিচালক। বৃষ্টির রাতে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকট যেন আষাঢ়ের বাদলের মতো ঝরেছে অবিশ্রান্ত। ছবিতে অসামান্য আবেশ তৈরি হয় সঙ্গীতেও। সৌম্য রিত নাগ ছবির আবহসঙ্গীত নির্মাণ করেছেন। যে মেলাঙ্কোলি, একলা থাকার আবেশ তিনি আবহে নিয়ে এসেছেন, তা মুগ্ধ করেছে দর্শকদের।

এখন স্পিড বা গতির যুগ। চারিদিকের মানুষ শুধু ছুটছে। তার মধ্যে থেকেও কখনও কখনও জিরোতে বসতে হয়, কখনও কখনও কথা বলতে হয় একা বা একটি মাত্র মানুষের সঙ্গে। আসলে কত অভিমান বরফের মতো জমে থাকে, শুধু আমরা দু’দণ্ড বসে কথা বলতে পারি না বলে। কত কিছু না বলে হয়ে পড়ে থাকে রাস্তার ধারে, কুড়িয়ে দেখার লোকটি পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ডিপ ফ্রিজ আসলে সেই অভিমানের কথা বলে, বলে বসতে, কথা বলতে, বললে হয়ত মিলতে পারে কোনও এক আশ্রয়, যা আশ্রয়ের খোঁজে পাখি হয়ে ঘোরে মানুষ মন।