মানস সরকার
যে বাংলা ভাষার ব্যবহার, প্রয়োগ নাকি ক্ষয়িষ্ণু, যে মাতৃভাষার অপপ্রয়োগ আর ঘনিয়ে আসা মৃত্যুতে নাকি আমাদের মতো বাঙালিদের ‘আঁখি’ জলে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, উঠছে, তার লালন, প্রকৃত চর্চা বা সংরক্ষণে কি জোটবদ্ধভাবে আমরা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠতে পেরেছি? ইতিহাস ও কালের স্রোতে স্নান করলে কি অন্য তথ্য উঠে আসে না?
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের, বিশেষত, মধ্যযুগের ইতিহাস পড়লে অন্তত উপরের প্রশ্নগুলির উত্তর একটু ভিন্ন স্রোতেই ভাসে। বরং মনে হয়, বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ই বাংলা ভাষাকে, সাহিত্যে, কাব্যে সংরক্ষণ বা লালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন গভীরভাবে। ১৪৫৯-৭৪ খ্রিস্টাব্দে বরবক শাহ যখন বাংলার সুলতান, যাঁর উৎসাহে মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’ লিখলেন, সে লেখার তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছিল ব্রাহ্মণের তরফে। চট্টগ্রামের শাসক পরাগল খাঁ-এর আমন্ত্রণে কবীন্দ্র পরমেশ্বর যে ‘পরাগলি মহাভারত’ রচনা করেন, তা হিন্দু তথা বাঙালি সমাজে ব্যাপক অর্থে আলোচিত কি? অথবা আরাকান রাজসভায় দৌলত কাজির ‘লোরচন্দ্রানী’ বা সৈয়দ আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ রচিত হওয়ার পৃষ্ঠপোষকতাও মুসলমান শাসকের তরফেই।
মধ্যযুগের বাংলা ভাষাচর্চার পরিধিবৃদ্ধির কারণ হিসাবে শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন পরিষ্কারই জানিয়েছিলেন, বাঙালি জাতির নবজন্ম ও ভাষাচর্চার মূল কারণই ছিল ইসলাম ধর্মের প্লাবনকে ঠেকানো। এবং লক্ষ করার বিষয়, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় ততদিন পর্যন্ত ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার ব্যাপারে সে অর্থে কোনও দায় অনুভব করেননি। মুসলিম রাজা হিসাবে হুসেনশাহ বা তার সন্তান নসরৎ শাহ বাংলা সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্পে যে দায়বদ্ধতা দেখিয়েছিলেন, তার প্রমাণ ইতিহাস বইয়ে যথেষ্ট।
জাতিতে ব্রাহ্মণ অর্থাৎ, উচ্চবর্ণের হয়েও যিনি বাংলাভাষার প্রথম সার্থকচর্চা করেছিলেন তিনি চন্ডীদাস। তবে তিনি কোনও শাসক বা রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় সে চর্চা শুরু করেছিলেন, বা জারি রেখেছিলেন এমনটা জানা যায় না। বড়ু চন্ডীদাসের জীবনী সম্পর্কে বসন্তরঞ্জন রায়ও নিশ্চিত করে কিছু বলে যেতে পারেননি। কারণ বঙ্গীয় পরিষদ থেকে যে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ পুথিঁটি প্রকাশিত হয়, তার শেষের কটি পাতা (যাতে কবিপরিচয় বা পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি থাকতে পারত) পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ অবশ্য এটি শ্রীজীব গোস্বামীর লেখা মনে করেন। কিন্তু আমার এ ব্যাপারে যুক্তি হল, উচ্চশাসক শ্রেণির উৎসাহে তা যদি সংরক্ষণ বা লেখার ব্যবস্থা হত, তা বাঁকুড়া জেলার কাঁকিলার মতো গ্রামে অযত্নে পড়ে থাকবে কেন! এর অনেক পরে কৃত্তিবাস যখন গৌড়শ্বরের নির্দেশে রামায়ণ অনুবাদে হাত দেন, সে সময় নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা, গৌড়শ্বরের পরিচয় নিয়ে। কৃত্তিবাসের নিজের আত্মবিবরণীতেও তা স্পষ্ট নয়। নানা মত আছে—রাজা গণেশ, জালালুদ্দিন, কংসনারায়ণ বা রকনুদ্দিন—যে কেউ হতে পারেন। অবশ্য কৃত্তিবাস নিজে উচ্চবংশীয়ই ছিলেন। সময়ের ফেরে অবস্থা পড়ে এলেও ওঁর পূর্বজ বংশ পূর্ববঙ্গীয় রাজার সভাসদ। কবি মালাধর বসুকে ‘গুণরাজখান’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন গৌড়েশ্বর। কে গৌড়েশ্বর? আবারও ধোঁয়াশা। কেন উপাধির শেষে ‘খান’। বিতর্কের আভাস?
মনসামঙ্গল কাব্যের কবি বিজয়গুপ্তর আত্মবিবরণীতেও মুসলমান শাসকের স্তুতি স্বীকার্য—
‘ঋতুশশী বেদশশী পরিমিত শক
সুলতান হোসেন শাহ নৃপতি তিলক।’
মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে যে-শান্তির গৃহ ছাড়তে হয়, তার মূল কারণ ছিল ডিহিদার মামুদ শরিফের অত্যাচার। কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব ছিল মানসিংহ-এর মতো সুবেদারের। মুসলিম শাসকের অত্যাচারের শিকার পরবর্তীতে শেষ মধ্যযুগের কবি বা আধুনিক প্রথম কবি ভারতচন্দ্রকেও সইতে হবে। তবে দুজনেই প্রসিদ্ধ হিন্দু উচ্চবর্ণীয় সমর্থন পাবেন বাংলা কাব্য, সাহিত্য ও সৃষ্টির কাজে। মুকুন্দরাম পাবেন মেদিনীপুরের জমিদার রঘুনাথ রায়-এর, ভারতচন্দ্র রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের। শেষোক্ত ক্ষেত্রে আমার শহর চন্দননগরের মস্ত বড় ভূমিকা আছে—ফরাসি ইজারাদার ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী হস্তক্ষেপ না করলে ভারতচন্দ্র নিরাপদে বাংলা ভাষাচর্চা জারি রাখতে পারতেন কি না সন্দেহ। বহুপ্রমাণ আছে। গল্পকথায় পড়তে চাইলে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়া যেতে পারে যদিও উপন্যাস প্রামাণ্য হয় না। পৃষ্ঠপোষকতার নিরীখে এখানে বাংলা উচ্চবর্ণীয় বা হিন্দু এবং মুসলিম-এর যদি অনুপাত নেওয়া হয়, ইতিহাস আমাদের মতো বাংলা প্রেমিদের কাছে রুঢ় ও কর্কশ লাগতে বাধ্য। এমনকি ১৯৫২ ও ১৯৬১-র বাংলাভাষা শহিদদের নামের তালিকা দেখলেও কিছুটা অদ্ভুতই লাগে।
সংস্কৃতি বা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে সমাজের ‘এলিট’ শ্রেণির উপর। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ শাসনের দৃঢ় মুষ্টিতেও মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষাচর্চা ও সংস্কৃতিতে আক্ষরিক অর্থে যে নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন, তাতেও বাঙালি উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্তদের যে অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল, মোটেও এমনটা নয়।
প্রখ্যাত এক সাংবাদিক দৈনিক একটি সংবাদপত্রে লিখেছিলেন, ‘সাম্প্রতিককালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো করে দ্বিতীয় কোনও কৃতি বঙ্গসন্তানকে আমরা বাংলাভাষার পক্ষে এত সোচ্চার, সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত লড়াই করতে দেখিনি। তিনি চাইতেন রাজ্য সরকারের দৈনন্দিন কাজকর্মে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ুক, এমনকী কলকাতা শহরের দোকানিদেরও বাধ্য করা হোক ইংরেজি বা হিন্দির সঙ্গে বাংলা হরফ ব্যবহার করতে।’
কলকাতার প্রতিনিধি নিযুক্ত শেরিফ সুনীলকে কি আজকের সো-কলড বাংলা প্রেমিদের আচরণ ব্যথিত করত, যারা বাংলা প্রেম নিয়ে ফেসবুকে বাকতালা মারে, শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি নন্দনচত্বরে ইলাস্টিক বেল্ট ধুতি, শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে কুম্ভিরাশ্রু বওয়ায় আর বাস্তবে আঙুল দিয়ে চেটে ‘পিৎজা’ খায়, সারা বছর একটা বাংলা বই পড়ে না, রক সঙ্গীতের তালে স্কচ না খেলে বডি ফিট হয় না, চরম ওয়েস্টার্ন অ্যাপারেলে ইনস্টাগ্রামে ছবি চিপকে ফলোয়ার খোঁজে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বাপ- বাপান্ত করে ইংরাজি মাধ্যমে নিজের উত্তর প্রজন্মকে ভর্তি করায় আর বাংলায় কিছু হবে না বলে ব্রেনড্রেন করায় নিজের সন্তানকে বিদেশে, সেই প্রজন্ম—যে প্রজন্মর কিছুদিন বাদে নিজের ‘বাঙালি’ আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে না পড়ে যায়!
কই, বাংলাভাষার অপমানে কোনও পদত্যাগ হয়েছে শুনিনি, আন্দোলন তো অস্ত গেছে আমাদের জীবনে। একটা রাজনৈতিক সময় ছিল, যখন সরকারি অফিসাররা বাংলায় ফিরে এসেছিলেন, সই-টই বাংলায় শুরু হয়েছিল। শেষ একযুগ তো ইংরেজ সাম্রাজ্য পূর্ণমাত্রায় ফিরে এসেছে। হিন্দি বলয়-টলয় তো আরও অনেক দূরের গল্প।
কথায়-কথায় কেউ বলে ‘সংখ্যালঘু’। একটা আঙুল তুললে তিনটে থাকে নিজের দিকে। শেষ করি বরং ওই তিনটে আঙুল দিয়ে।
আঙুল-১
প্রগতিশীল সম অধিকার সম্পন্ন সমাজে প্রকৃত ইতিহাসচর্চা না হলে ভাষা, সংস্কৃতিও ভুল দিকে এগোবে। মীর মহম্মদ মাসুমের ‘সিরাজ তাবাকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে সেনবংশের পতন, বাংলার কথা বহুলাংশে রয়েছে। যাঁরা ইতিহাস লিখেছেন, লিখছেন, লিখবেন, তাঁদের কাছে সব ধরনের বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি থাকা দরকার। ইতিহাস ও সাহিত্যপ্রণেতাদের গুরুগ্রন্থগুলির পাশাপাশি এই ধরনের গ্রন্থগুলিরও সংরক্ষণ হওয়া দরকার। একটি সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস নিজের করে, নিবিড় হয়ে কীভাবে লিখেছে, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে, আলোচনা করা দরকার,যা আখেরে বিভেদ দূর করতে সাহায্য করবে। আগেই বলেছি, হিন্দুবাঙালি একা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস সংরক্ষণে অংশ নেয়নি।
আঙুল-২
হুগলি জেলার অধিবাসী সৈয়দ হামজা মূলত দোভাষী পুঁথিকার ছিলেন। ওঁর রচিত গ্রন্থ ‘মধুমালতী’, ‘আমীর হামজা’, ‘হাতিম তাই’, ‘সোনভান’, যাতে স্পষ্ট, বাংলার মনীষীদের তৎকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ভূমিকা। কিন্তু নবাব ও সহযোগী অভিজাত শ্রেণি বাংলাভাষা চর্চা দূরে সরিয়ে রাখেন। হিসাবপত্র বাংলায় লেখা হলেও তা দরবারে পৌঁছত ফারসি ভাষায়। শিক্ষানীতি না থাকায় দৃশ্যতই অরাজকতা শুরু হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ পর্যন্ত পরবর্তীতে অপেক্ষা করতে হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। সে হোক। অন্ধকার যুগ তো দেখতেই পাচ্ছি। অভিজাত, উচ্চবংশীয় কোনওদিনই কামকাজে ছিল না। নবজাগরণটা এই ফাঁকে শুরু হোক।
আঙুল-৩
সংসদীয় গণতন্ত্রে কোথাও রাষ্ট্রভাষা হিসাবে হিন্দির উল্লেখ নেই। বরং নিজের ভাষা সংরক্ষণ ও চর্চা চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ অধিকার দেওয়া আছে।
তাই আঙুল এদিক-ওদিক না তুলে সবগুলো এক জায়গায় করে মুষ্টিবদ্ধ করি হাত।
আসুন, এ বার মরে বাঙালি হব, বাঙালির ঘরে জন্ম লব.........
_________________________
