রক্তিম ভট্টাচার্য
মধ্যরাতের কলকাতা শাসন করত নাকি চারজন যুবক! বাংলা কবিতায় কান পাতলে শোনা যায় তেমনই। ঠিকই, তবে আধা। অন্তত, আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে। যুবক দূরের কথা, নিছক ছুঁড়ো থেকে মাঝবয়সী বা বুড়ো – কলকাতার একটি বিশেষ জায়গার অন্দরমহল শাসন ঠিক কতজন করে, বলা মুশকিল। সেখানে দিব্যি রাত একটার সময় লম্বা করিডোর বেয়ে ছায়া সরে যাচ্ছে, থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে এক-হাত লম্বা স্মার্টফোন। না, আত্মা নয় – এক্কেবারে আত্ম। মানে আমিই এমন করে থাকি একেকদিন। আমার মতো আরও অনেকেই। কাজের সূত্রেই। একরাশ ভূতের ভয় চেপেই। কে জানে, আমার উল্টোদিকের সুন্দরী হাত-কাটা আদৌ ইহজগতের বাসিন্দা কি না!
কর্পোরেট কোনও অফিস বা নিউজ রুম – পরিচিত চিত্র। কিন্তু আমাদের এই বিল্ডিং যে ইতিহাস, মিথ, মিথ্যে এবং সত্যির কায়ারাসকিউরো নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বহুদিন, সেখানেও রাত ঘনালেই রীতি, নীতি আর ভীতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে জমে ওঠে শ্রুতিমধুর সিম্ফনি – তা প্রাচীনমাত্রেই জানেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন যদি এইসব ভবনগুলোরও হত, তাহলে কোনও আদিজন্মের বহুতলের সঙ্গে আর নাম ‘লিঙ্ক’ করাতে হত না। ভূত হোক বা ভবিষ্যৎ, অথবা রসকষহীন বর্তমান – সময়ের স্কেল টেনেই সহাস্যে এমনিই বলতে পারত, “আকাশবাণী! নাম তো শুনা হি হোগা’!
মহানগরীর আনাচে-কানাচে, ভাঁজে-খাঁজে লুকিয়ে থাকা ডায়নোযুগীয় বা কালোত্তীর্ণ স্ট্যাম্প-সাঁটা বাড়ি, অট্টালিকা, বহুতল বা ভবনের সন্ধান করতে চাইলে, সরকারি বেতারকেন্দ্রের নাম একেবারে পরীক্ষায় ফাস্টো-কেলাস শিক্ষার্থীর (‘ছাত্র’ বা ‘ছাত্রী’ লিখলেই ছদ্ম-লিঙ্গসাম্যবাদীরা ঘিরে ধরবেন) মতো তালিকার ওপরে জ্বলজ্বল করবে, এটা বলতে পারার জন্য সান্ত্বনা পুরস্কারটুকুও নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাড়িটার সুনামের চাইতে দুর্নামই বেশি। গারস্টিন প্লেসের ছমছমে ঠিকানা পালটে ইডেনের পাশে অমন মনোরম পরিবেশে এসেও বেচারার নিস্তার নেই।
বাড়িটার গল্প, থুড়ি গপ্প, দূর থেকে শোনা থাকলেও খোদ যখন রাত-বেরাতে তার-বেতারের পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে চোখে পড়ে সুপ্রাচীন ইতিহাসের কালখণ্ড, অবাক না হয়ে যাই-ই বা কোথায়! ভূত তো এখানেই মানায়! কাজ মিটতে মিটতে সরকারি হিসেবে এগারোটা, বাড়ির ফোন আর মন-যাপন সেরে ব্যক্তিগত হিসেবে ফাঁকা হতে বারোটা বেজেই যায়। সকালে আবার পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ডেস্কের সামনে যেতে হয়। এই মাঝের পাঁচ ঘণ্টা বেশিরভাগ দিন নিছক বেরসিকের মতো অ্যালার্ম টেনে ঘুমিয়েই কাটে, তবে হাতে-গোনা যে’কটি দিন জীবন-খাতায় লেখা থাকবে নিশিযাপনের খতিয়ানে, তা-ই সই। মণি-মুক্তোখচিত না হলেও, পাথর‘কুচি’তো বটে!
দোতলায় আমাদের সংবাদ-বিভাগের মূল কার্যালয়, একতলায় স্টুডিও। যে-সব ঘরে সন্তর্পণে ঢুকতে হয় সকালে-বিকেলে, চলে রেকর্ডিং অথবা ‘লাইভ অনুষ্ঠান’, সে-সব ঘরেই হঠাৎ রাতের বেলা ঢুকলে মনে হবে, অ্যাত্তোবড় একখানা জেলের সেলে ঢুকে পড়েছেন। বিরাট বিরাট রেকর্ডিং স্টুডিওগুলোর মেঝেতেই পাতা হয় রাত্রির সংসার। ডানপাশে মাইক্রোফোন, বাঁয়ে টানটান চাদরের কোণ। দেওয়ালে হেলানো তানপুরা, দু’ইঞ্চি ছেড়ে নাসিকাগর্জনে মগ্ন বাবুরা। একদিকে চেয়ার, অন্যধারে ঘুমের লেয়ার। ইতিউতি শুয়ে আছেন বিখ্যাত ঘোষক বা সংবাদ-পাঠক, অথবা ডিউটি অফিসার। ছড়িয়ে আছে ঘামে-জ্যাবজ্যাবে জামা বা অযত্নলালিত গেঞ্জি। কে বলবে, আর হয়ত কয়েক মুহূর্ত বাদেই শ্রোতারা তাঁরই জলদমন্দ্র কণ্ঠে শুনবেন, “আকাশবাণী কলকাতা, অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে গীতাঞ্জলি প্রচারতরঙ্গে”। মেজাজে ভারিক্কি যে ‘ধুততেরিকি’ বলে গুটিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ আগেই, সে বোঝে কার সাধ্যি!
এই স্নিগ্ধ-মধুর রোমাঞ্চ থেকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে উঠে যদি নেহাতই করিডোরে যাওয়া যায়, সেখানে হাতছানি দেয় ভুতুড়ে শব্দাবলী। হঠাৎ হয়ত মৃদু পদধ্বনিতে থমকে গেলাম এক মুহূর্ত! “আসছে, সে আসছে!” আসছেই তো। বাঁক ঘুরতেই অন্য কোনও স্টুডিওর দিকে দৌড়ে চলে গেলেন কেউ একজন, যাকে আর যাই হোক ভূত ভাবা যায় না কোনওভাবেই। আকাশবাণীর মূল প্রচারতরঙ্গগুলির পাশাপাশি দুটি এফ এম চ্যানেল আছে – রেনবো এবং গোল্ড। সেখানই সারা রাতই অনুষ্ঠান চলে। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা মেলে তাবড় কোনও সেলিব্রিটির। লোকজনের বেমক্কা ভিড় ড্রিবল করতে চাইলে ওটিই তাঁদের ইন্টারভিউ দিতে আসার সময় কি না!
এসবের ফাঁকে হঠাৎ তানপুরা বা পিয়ানোর আওয়াজ পেলেও প্রাথমিকভাবে চমকে ওঠাই যায়। তবে কিছুদিন ওখানে রাতে থাকার অভ্যাস হলে বোঝাই যাবে, নির্ঘাত কোনও মজলিশি আসর ছেড়ে দৌড়ে যেতে গিয়ে কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন গণেশবাবুর অনুচরেরা। আর যা পেল্লাই সাইজ, মাঝে-মাঝে বরাহনন্দনের অতি-ক্ষুদ্র সংস্করণ বলেও ভুল হতে পারে। হয়ত বা, এসব শব্দগুচ্ছ থেকেই সম্প্রচারিত হয়েছে ভৌতিক কাহিনির যাবতীয় সমগ্র। পরক্ষণেই মনে পড়ে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মহীরূহদের স্মৃতিচারণ। সেখানে স্পষ্টতই তাঁরা আধিভৌতিক বা ‘সুপারন্যাচরাল’ অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেছেন। এখন, তাঁরাও সেই জগতেরই বাসিন্দা বলে ভয়টা তৎক্ষণাৎ আরও বেড়ে যায়। প্রমাণ দিতে যদি এখনই তাঁরা হাজির হন…
তবে মধ্যরাতের একতলার করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা স্মৃতির সারণী বেয়ে চলার থেকে কম কিছু নয়। সম্প্রতি, আকাশবাণীর প্রাক্তন বার্তা সম্পাদক এবং ‘সমীক্ষা’খ্যাত ভবেশ দাশের বইপত্র নাড়া-ঘাঁটা করছিলাম। আগ্রহীরা জানেন, তিন খণ্ডে উপলব্ধ তাঁর ‘কলকাতা বেতার’ গ্রন্থে কত কী সুলুকসন্ধান ছড়িয়ে রয়েছে ইতিউতি। ‘চাঁদের পাহাড়’-এ যেমন আপাত-অমিল হীরের নাগাল পেয়ে গিয়েছিল শঙ্কর, ওই বইয়ে পড়া পাতাগুলি চোখে ভাসলে, আর করিডোরে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলে চাঁদের পাহাড় কেন, এল ডোরাডো আবিষ্কার করে ফেলাও দুঃসাধ্য নয়। একপাশের দেওয়ালে সাজিয়ে রাখা চিত্রডালি, কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন প্রবাদপ্রতিম নট ও নাট্যকার শম্ভু মিত্র তাঁর লাইভ রেকর্ডিং-এ। কোথাও বা বিশ্বজয়ী ফুটবলার পেলে-র সাক্ষাৎকারে উপেন তরফদার। কোথাও কবিতা-পাঠে কাজী সব্যসাচী বা কালিদাস রায়। দেখি সে-সব মায়াময় অতীত, ভূত তো আসলে তা-ই! ছোঁয়ার চেষ্টা করি কালের কপোলতলে চিহ্ন রেখে যাওয়া কুঁচকে-যাওয়া ইতিহাসের পেলব ওম। ইথারতরঙ্গে ভেসে আসা কথার পেছনে স্মৃতির অবয়ব হয়ে রয়ে যান যাঁরা, তাঁদের অনুভব করতে রাতের থেকে ভালো সময় আর আছে কি? একেই কি বলে ‘নিশি’-র ডাক?
রাতের নিউজরুমে কাজ করাও কম বর্ণময় নয়। আসলে, রাত এগারোটার পর একতলা বাদে আর কোথাওই ঠিক শরীরী অস্তিত্বের খোঁজ মেলে না সচরাচর। খবর শেষ হয় দশটা দশে, একে একে বেরিয়ে যান সংবাদ-পাঠক, বার্তা সম্পাদক, সম্প্রচার সহকারী বা ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা। শূন্য বুকে খাঁ খাঁ হয়ে প’ড়ে থাকে ধূলিমলিন বুলেটিন। ‘মৈত্রী’ প্রচারতরঙ্গে ‘উপমহাদেশের খবর’ শেষ হয় এগারটায়। মিনিট পনেরোর মধ্যেই সে-ঘরও খালি। এই সময় দোতলায় যেতে নেই, বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে! শুনেছিলাম একদিন। একটা গল্প বলেই ফেলি এখানে। সংবাদ-বিভাগের এক প্রাক্তন উচ্চপদস্থ আধিকারিক (সম্ভবত, যুগ্ম-অধিকর্তা বা সমপদস্থ কেউ হবেন) নিউজরুমে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছিলেন মাত্র একটি বাক্যে। সবটাই শোনা কথা। তিনি নাকি ছিলেন চূড়ান্ত অবিশ্বাসী ব্যক্তি। ভূত দুত্তোরছাই, ভগবানেও বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না তাঁর। পদের কারণেই হোক বা আত্মমর্যাদায়, তাঁর চেয়ে বেশি ক্ষমতাসীন কেউ ইহজগতে থাকতে পারে, তা নিশ্চয়ই তাঁর বিশ্বাস হয়নি। অতএব, সহকর্মীদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে তিনি রাত কাটিয়েছিলেন নিউজরুমে। গাঁজাখুরি ভূতের গপ্পের মতো সকালে ঘর খুলে বা দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করতে হয়নি। দিব্যি সুস্থ ছিলেন, বরং খানিক বেশিই সচেতন হয়ে পড়েছিলেন তার পর থেকে। বেরিয়ে যাবার আগে একটা বাক্যই বলে গিয়েছিলেন, “নিউজরুমে কখনও কোনওদিন একা রাত কাটিও না”। তাঁকেও এরপর আর বেশি রাতের দিকে ডিউটি করতে হয়নি বলেই কানাঘুষো শোনা যায়।
এই-সব কথন, কাহন এবং কাহিনির মাঝেই একেকদিন কেটে যায় বিনিদ্র রজনী। কখনও সকালের জাতীয় বা স্থানীয় সংবাদ বুলেটিন তৈরির প্রস্তুতি, কখনও নির্ভেজাল আড্ডায়। দ্বিতীয়টি অবশ্যই, সঙ্গী পেলে। অশরীরী সঙ্গীর সঙ্গে আড্ডার ইচ্ছে হয়নি কখনোই। আমার অনিচ্ছা আর অনাগ্রহ দেখে তিনিও সম্ভবত বিব্রত বোধ করতে চাননি, ফলত আমার আর আকাশবাণীর ঐতিহ্যশালী ভৌতিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকা হয়নি, অন্তত এ-লেখা যখন লিখছি ততক্ষণ পর্যন্ত। জানলার বাইরে দিয়ে উড়ে আসা ময়দানি হাওয়া, ধর্মতলা বা বাবুঘাটের দিকে ছুটে যাওয়া নির্দয় বাস বা চার-চাকা আর মধ্য কলকাতার সাইকেডেলিক চিত্রকল্প জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিশ্রুতির ঘ্রাণ – এই বা কম কী! একটা ঘটনা মনে করে হাসিই পায়। সকালের ‘জেলার চিঠি’ আগেরদিন রেকর্ড ক’রে নির্ধারিত সফটওয়্যারে তুলে দিতে হয়। আমার অভিজ্ঞতায় একবার, জেলা-সংবাদদাতার ভুলে, আরেকবার রেকর্ডকারীর ভুলে সে-জিনিস করা হয়ে ওঠেনি। সেই মাঝরাতে, জেলা সংবাদদাতাকে ফোন ক’রে চিঠি পাঠাতে তাগাদা দেওয়া, রাত আড়াইটেয় নিউজ স্টুডিওতে বসে তার রেকর্ডিং – স্বপ্নের মতোই মনে হয়।
ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়ে দুটো, দুটো পেরিয়ে তিনটে হয়ে চারটের ঘর ছোঁয়। মনে মনে গুনি, গ্যারেজ থেকে সরকারি গাড়িরা একে একে রওনা দেবে সকালের শিফটের লোকজনকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে। ঘুমনোর পরিকল্পনা থাকলে আবার অন্যরকম রুটিন। সকালের প্রথম সংবাদ ছ’টা কুড়ি পাঠের কথা থাকলে চারটেয় অ্যালার্ম দিয়ে, আগেরদিনের খবরের রেকর্ডিং শুনে, বুলেটিন প’ড়ে, নতুন খবর ঘেঁটে কাজে বসা। লোকাল ডেস্কে ডিউটি থাকলে একটু বেশিক্ষণ শুয়ে থাকা যায় অবশ্য। সাড়ে পাঁচটায় কাজে বসলেই যথেষ্ট। সবটাই নির্ভর করে, দ্রুততা, পারদর্শিতা, দক্ষতা আর আত্মবিশ্বাসের ওপর। কোনওটাই এখনও যথেষ্ট রপ্ত করতে পারিনি বলেই ধারণা। তাই একটু আগেভাগেই তোড়জোড় শুরু করি। রাত কেটে যায় বোঝার আগেই। নিস্তব্ধ আকাশবাণী ভবনের করিডোর অপেক্ষা করে নতুন পদশব্দের। ভোর হয়ে এল বলে…
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার উপুড় করার মতো সমৃদ্ধি আসেনি এখনও। এই ব্যাপারে অন্তত চরম বিত্তশালী হয়ে ওঠার তীব্র বাসন আছে। আর এসবের মাঝে যেটা বলা হল না, যে-সব রাতের শেষে অস্থিরতা নেই, সকালের ডিউটি নেই, আবার বাড়ি ফেরার সাধ্যও নেই পরিবহনের সমস্যায় – তখন কি দফতরের বাঁধা-গরু একই যাপন করে? সে-কথা না-হয় অন্য আরেকদিন হবে!
