অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

গত বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি। খবরের কাগজটা খুলতেই ভিতরের পাতা থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল লিফলেট। প্রথম পাতায় বড় বড় করে যে চারটি লাইন লেখা ছিল তা হল এই।

ভাষা রে 

মস্তি আর পেটপুজোতে

দিনটা কাটবে খাসা রে। 

সবাইকে জানাই হ্যাপ্পি ভাষা দিবসের শুভেচ্ছা। 

লিফলেট উল্টে দেখি এক আমাদের চত্বরেরই এক রেস্তোরাঁর নাম ও ঠিকানা। আরে এই তো! ‘আয় বাঙালি আয়।’ আমার স্কুলজীবনের বন্ধু অর্ক খুলেছিল এই রেস্তরাঁ। বাংলায় এমএ পাশ করে দীর্ঘ পাঁচ বছরের অপেক্ষাতেও যখন চাকরি এল না দ্বারে, ফোনের ওপাশ থেকে অর্কর দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে শুনেছিলাম, “হায় বাঙালি হায়। কোন কুক্ষণে পড়তে চেয়েছিলাম বাংলা?” বাবার থেকে টাকা ধার করে এক ছোটখাটো বাঙালি রেস্তোরাঁ খোলা ছাড়া ওর গতি ছিল না কোনও। সেই ‘আয় বাঙালি আয়’ এত বছরে আড়ে বহরে বেড়েছে বেশ। জানি, এসইউভি আসার পরে অর্ক ওর লজঝড়ে হয়ে যাওয়া স্কুটি স্পর্শ পর্যন্ত করে না। ঝটিতি ফোন করলাম আমার পুরনো বন্ধুকে। কথোপকথন ছিল অনেকটা এরকম।

-আমার রিসার্চ বলছে ভাষা দিবসে বাঙালি গেলে বেশি। মনের মধ্যে বাংলা বাংলা ভাব এলে তড়াক করে চাগিয়ে ওঠে খিদে। তাই আমার এই সামান্য আয়োজন বন্ধু! লিফলেট সাতসকালে পৌঁছে গিয়েছে, এ বড় খুশির খবর।

-তা কি কি আয়োজন শুনি!

-কাতলা কালিয়া, মটন তুলতুলে, চিল মারো চিংড়ি, ভাষায় ভাসা সর্ষে ইলিশ, ডাব চিংড়ি—কটা আইটেমের নাম বলব ভাই? তবে এবারে একটা নতুন ডিশ এনেছি। একেবারে ভাষা দিবস স্পেশাল। জীবনানন্দ পায়েস। এই এথনিক পায়েসে খুঁজে পাওয়া যাবে জীবনের আনন্দ। তাই তো জীবনানন্দ। 

-জম্পেশ আইডিয়া ভাই।

-আরও একটা জাম্বো অফার আছে। লিফলেটে দিইনি। দোকানে এলেই সারপ্রাইজ। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২১০০ টাকার বিলিং হলেই কড়কড়ে ২১ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট। সঙ্গে অআকখ লেখা একটা বুকমার্ক ফ্রি। কেমন দিলাম?

-সাবাস।

-কম্পিটিশনের বাজারে পিছিয়ে থাকলে চলবে? ভাষা দিবসের বাজার নিয়ে ভাসা ভাসা আইডিয়া থাকলে যে পিছিয়ে পড়তে হবে।

বন্ধুর সঙ্গে এই ফোনালাপ আমার চোখ খুলে দিয়েছিল বলা চলে। ফেব্রুয়ারির ক্যালেন্ডার ‘আবার সে এসেছে ফিরিয়া’ বলে যেই হল্লা করতে শুরু করে দিল দিনকয়েক আগে, প্রশ্ন করলাম এআই প্ল্যাটফর্মকে। না না। বলতে ভুল হল খানিক। পরের ফ্রেম আগের ফ্রেমকে টপকে চলে এলো। প্রশ্ন করেছিলাম বাবাকে। কয়েক বছর আগে পর্যন্তও মনে কোনও প্রশ্ন এলে গুরুজনদের কাছেই তো শরণাপন্ন হয়েছি। বাবাকে বললাম, “ভাষা দিবসের মার্কেট সাইজের উপরে একটু আলোকপাত করো প্লিজ।” পিতৃদেব সংবাদপত্রে মগ্ন ছিলেন। প্রশ্নটা শোনার পরে মুখের সামনে থেকে কাগজ নেমে গেল। আমার চোখের দিকে উনি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন প্রায় দশ-বারো সেকেন্ড। এর পরে গুলতির ঢিলের মতো বাবার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, “ছিঃ।” কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা। টিকটিক করা দেওয়াল ঘড়ির পাশে রবিঠাকুরের ছবি। আমাকেই দেখছেন। এর পরে শুনলাম, “এমন একটা বিচ্ছিরি প্রশ্ন করতে লজ্জা করল তা তোমার? এই দিনটার সঙ্গে কত আবেগ মিশে আছে জানো?” ইতিমধ্যেই সত্তরোর্ধ্ব মানুষটির দু চোখের কোণায় উদয় হয়েছিল কয়েক বিন্দু জল। আমার ব্যস্ত রিলজীবন শিখিয়েছে, ইমোশনের স্থায়িত্ব কুড়ি সেকেন্ড মাত্র। ছুটে চলে এলাম নিজের ঘরে। হাঁ করে চেয়ে থাকা ল্যাপটপে খুলে ফেললাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি জগদ্বিখ্যাত প্ল্যাটফর্ম। শুধোলাম, ‘হোয়াট ইজ দ্য মার্কেট সাইজ অফ ভাষা দিবস?’ প্রথমেই স্ক্রিনে যা ফুটে উঠল তা হল, ‘ভেরি গুড কোয়েশ্চেন।’ এর পরে হুড়মুড় করে টাইপ হয়ে যাওয়া তথ্য আমায় জানান দিল, শুধুমাত্র কলকাতায় এই দিনটিকে কেন্দ্র করে ব্যবসার পরিমাণ ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতি বছরের ব্যবসার পরিধি আগের বছরকে দুয়ো দিচ্ছে প্রবল। বলাই বাহুল্য, এর মধ্যে সিংহভাগ দখল করে রয়েছে ভাষা দিবস স্পেশাল ভুরিভোজ। প্রায় ৩ কোটি টাকার লেনদেন হয় টি শার্ট, ব্যাজ, হস্তশিল্পে। এগুলো সবই অক্ষর-স্পেশাল। বর্ণে বর্ণে কাঞ্চন ছবি। ভালোবাসি বাংলা থিমের দিনভর ইভেন্টেও খরচ হয় বিস্তর।

এমন থিমের অনুষ্ঠানে যাওয়ার তো সৌভাগ্য হয়েছে আমারও। বছর দুয়েক আগে ২১শে ফেব্রুয়ারির একটি অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ছে। অনুষ্ঠান তো নয়, ইভেন্ট। পরিচালনা করছিল জেন-জির যে প্রতিনিধি, তার গলায় শুনেছিলাম, “হাই গাইজ। এবারে আমরা খেলব একটা জব্বর গেম। একটাও ইংরিজি শব্দ ব্যবহার না করে আমাদের মধ্যে কে কতক্ষণ কনটিনিউয়াসলি বাংলায় কথা বলতে পারি, সেটাই মেজার করব আমরা। সামনে রাখা বিশাল পর্দায়, আই মিন, জায়ান্ট স্ক্রিনে চলতে থাকবে স্টপওয়াচ। রয়েছে দারুন প্রাইজ।” অবাক হয়ে দেখেছিলাম, বাংলা বলার সময় যে যতবার ঠোক্কর খেয়েছেন, তাঁর কলার তত উঁচু হয়েছে। না বলতে পারাটাই যেন এক মস্ত সাফল্য। গেম শোতে প্রথম হওয়া বছর পঁয়ত্রিশের তরুণটি মঞ্চের উপরে হাততালি পেলেও স্টেজ থেকে নেমে আসার পরে প্রহসনের শিকার হয়েছিল। শুনেছিলাম, “এই বাংলার জন্যই মালটার জীবনে কিছু হল না।” শুনেছিলাম, “বাংলা ধুয়ে খেলে কি পাবি শালা। বেকার ছেলে। ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ায়। আর বাংলা বলে।” শুনেছিলাম, “ইডিয়ট কোথাকার।” 

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে এ মরা সময়ে কটি বাড়ির বারান্দায় জ্যোৎস্নার চন্দন লাগে? নদী নর্তকী হয়? একুশে ফেব্রুয়ারির উন্মাদনা আসলে কি? চেনা-অচেনা বৃত্তে নিজের মতো করে অনুসন্ধান চালিয়েছিলাম। চেনা বাস, চেনা রুটের সহযাত্রীরা, এইমাত্র ছুটি হয়ে যাওয়া নামজাদা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা, পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে আড্ডা মারতে আসা সহনাগরিকরা, শপিং মলের বিলিং কাউন্টারে আমার সামনে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতারা—সবাই আমায় উত্তর জুগিয়েছেন। কয়েকটা তুলে দেওয়া যাক। 

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিল। এর আগে বাংলাদেশে সবাই উর্দুতে কথা বলত।

মাতৃভাষা দিবসে সবাই মাতৃভাষায় কথা বলে। এই দিনে অন্য ভাষা ব্যবহার করা মহাপাপ।

এই দিনটা ইজ অল অ্যাবাউট সেলিব্রেটিং বাংলা উইথ গ্রেট ফুড।

এই দিনে টেরাকোটা গয়না পড়তে হয়।

আমার গার্লফ্রেন্ড বলে, ওই দিনটায় পায়েস খাওয়া মাস্ট। সত্যি নাকি?

বাংলা আগে রিজিওনাল ল্যাঙ্গোয়েজ ছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। তাই আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস।

ওটা সম্ভবত জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন।

এক ভাষাবিদকে বলতে শুনেছিলাম, “বাংলাপ্রেমের কোনও সূচক আছে কি না জানি না, তবে থাকলে ২১শে ফেব্রুয়ারি তা শীর্ষে থাকত। মুশকিলের ব্যাপার হল, সূচকটা ওই দিনে ১০০ ছুঁয়ে থাকলে অন্য দিনে শূন্যে এসে নামে। এটাই বিপদ। আরও মুশকিল কি জানো? ভাষার প্রতি ভালোবাসা আসলে কি জিনিস এই উপলব্ধিই অধিকাংশ লোকের হয়নি আজও। ইদানীং দেখছি, ওই একটি দিনে মহা সমারোহে জেগে উঠছেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। আমি বাংলায় গান গাই না থাকলে আমরা যে কি করতাম! ভদ্রলোকের আরও একটা গানের নাম করতে বলুন। আমতা আমতা করবে সব। এই তো বাঙালি!”

নিজের ভাষাকে ভীষণ ভালবাসি বলেই হয়তো বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা আজ আনুবীক্ষণিক। নয়া প্রজন্ম ফেলুদা পড়ে ইংরিজি অনুবাদে। “বাংলাটা না, আমার ঠিক আসে না”, সগর্বে। ভাষায় ভালোবাসা আছে বলেই পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে কোনও বহুজাতিকের নতুন পণ্য ‘পেশ’ করাকে মেনে নিতে পারি আমরা। আমাদের নির্ভেজাল ভাষাপ্রেমের জন্যই দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় করা হল না আজও। ইত্যাদির জায়গায় জিতে যায় বগেরা বগেরা। কেন না-র জায়গায় কেন কি সম্মতি আদায় করে নেয় সর্বজনের। আমরা দাঁত ক্যালাই। মুশকুরাই। মা ষারদা রোল কর্নারে ডাবল আন্ডা রোল খাই। ‘এখানে যন্ত সহকারে ধোলাই দিয়ে থাকি’ পড়লেই একবারে বুঝে যাই, লন্ড্রি! আর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আই লাভ বনলতা সেন’ লেখা টিশার্ট পরে আমরা ভীষণভাবে বাঙালি হয়ে যাই। বাংলায় মাতি সোল্লাসে। গর্জন করি। জয় বাংলা।

এই দিনটির মর্মার্থ বোঝানোর যোগ্যতা আমার নেই। চাইলেই তা পড়ে নেওয়া যেতে পারে। ইতিহাস সহজলভ্য। আবারও ফিরে যাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে। ওরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ! বন্ধু অর্কর মেনুকার্ডের আইটেমগুলো মাথার মধ্যে কিলবিল করছিল। ভাষা দিবস উদযাপনের পরে বাঙালির খিদে বেড়ে যায় যে! বললাম, ‘একটা রেস্তোরাঁ খুলছি জানো। বাঙালি রেস্তোরাঁ। ২১শে ফেব্রুয়ারির উপযুক্ত আমায় কয়েকটা পদের নাম দাও প্লিজ।’ 

নামগুলো তুলে দিলাম। 

রক্তিম রেশমী কাবাব

বর্ণপরিচয় বেগুনী

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো পোলাও (কেশর, গাজর দিয়ে লাল আভা সহযোগে)

মাতৃভাষা মাটন কষা।

একুশে রসগোল্লা।

কোথায় যেন শুনেছিলাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের আলোতেই আলোকিত হয়। 

কার কলার ধরব? থাপ্পড় মারব কাকে?

ফেসবুকে দেখা একটি পোস্টের কথা বলে শেষ করি। কোনও এক ২১শে ফেব্রুয়ারিই তা ফুটে উঠেছিল পর্দায়। অমর বলে একটি ছেলের একুশতম জন্মদিনের উদযাপন ছিল। অনুষ্ঠানবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অমর, সবান্ধব। হাতের গ্লাসে সোনালী আলো। গেটের বাইরে ফুল দিয়ে লেখা হয়েছিল, অমর একুশে।