গৌতম রায়

টুপটুপ করে শব্দ গুলো ঝরে পড়ছে। ঠিক যেমন করে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে শরৎ আসবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। শারদোৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে আমাদের সকলের মন। সেভাবেই যেন আমাদের দুঃখিনী বর্ণমালা ঝরে পড়ছে আমাদের চলবার পথে। বন্ধনহীন গ্রন্থিকে যে পথ বেঁধে দিয়েছে। সেই বাঁধনে আমরা হয়ে উঠেছি ,চলতি হাওয়ার পন্থী।

ভাষা কি চলতি হাওয়ার পথ বেয়ে ধাবমান হয়? নাকি , আদ্দিকালের বুড়ি ঠানদিদির পথ ধরে , লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে সে চলে? হাওয়ায় ভেসে ভাষার গতি সবল হয়? নাকি লাঠির ঠুকঠাক মন্দ্রমধুর পদচারণার তালে তাল মিলিয়ে চলবে তার পথ চলার ছন্দ?

শীতের হাওয়ায় নাচন লাগিয়ে , উঁহু-হু কী শীত। কষে গাও গীত। এমন কথা আজকের পঞ্চাশোর্ধদের কাছে খুব চেনা, খুব শোনা একটা শব্দ। তবে আজকের ছোট ছেলেমেয়েদের আর শীতের সকালে বাড়ির লোকেরা চাদর মুড়া দিয়ে রোদে বসিয়ে দেয় না। শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতে সময়ের মরশুমি রোদে দাঁড়াবার সময় এখন তো আর ছেলে, বুড়ো কারুরই নেই। গ্রাম ও বদলে যেতে শুরু করেছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা রেখে। তাই শীতের সকালের 'ওম', এমন শব্দের সঙ্গে আজকের প্রজন্মের পরিচয়টাও কেমন যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

এই যে ছোট ছেলেমেয়েদের মাথাটুকু আলগা রেখে গোটা শরীরটা চাদর মুড়ি দিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ, সেটাকে এককালে বলা হত, গুড়ের নাগরির মতো। গুড়ের নাগরি দেখতে এখন ছুটে যেতে হয় জয়নগর, মথুরাপুরে। ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো এখন প্ল্যাস্টিকের জারে করে ঝোলা গুড় বিক্রি করে। কিছু মানুষ যে একদম সরষের তেলের মতো পাতলা গুড়কে 'পয়রা' বলে, সে শব্দ ও প্রায় ধীরে ধীরে মানুষজনের কাছে অচেনা হয়ে উঠছে।

তাই গুড়ের নাগরির মত করে চাদর বেঁধে দেওয়ার রেওয়াজ জনিত শব্দবন্ধ এখন ধীরে ধীরে ঠাঁই করে নিচ্ছে নিত্যনতুন অভিধানে। মানুষের বাস্তব জীবনের ছবি থেকে এভাবে ধীরেধীরে চলতি শব্দ মুছে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া শব্দ, যা ভাষার একটা অলঙ্কার ও বটে, তাকে খুঁজে নিতে আমাদের দেখতে হচ্ছে ডিকশেনরির পাতা।

বিভূতিভূষণের লেখাতে ছোটদের পরিধেয় হিসেবে 'দোলাই'-এর খুব ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এই দোলাই শব্দটা এখন আমাদের ব্যবহারিক জীবন থেকে একদমই হারিয়ে গিয়েছে। বিভূতিভূষণ ,তারাশঙ্করের সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে দোলাইয়ের ব্যবহার এখন আমাদের খুঁজতে হয়। আবার এই ধরনের অঞ্চল ভিত্তিক শব্দ, বহুক্ষেত্রেই সেগুলি অভিধানে ঠাঁই পায় না। 

প্রাচীন মানুষজন, যাঁরা এখনও এই দোলাই নামক পরিদেহ বস্ত্রটি কথা জানতেন, তাঁরাও ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক নিয়মে হারিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আগামী দিনে যাঁরা তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণের সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সমকালীন সমাজ সভ্যতার ধারাবাহিকতা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে যাবেন, তাঁদের কাছে হয়তো শিশু পরিধেয় ওই দোলাই বিষয়টি, একটা আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তাঁরা সঠিকভাবে হয়তো বুঝতেও পারবেন না, দোলাই নামক পোষাকটি কিভাবে তৈরি হত। কিভাবে শিশুরা এটিকে ব্যবহার করত। সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী' ফিল্মে হয়তো তাঁরা দোলাইয়ের বাস্তব চিত্র খুজবার চেষ্টা করবে।

ভাবেই হয়তো ভাষার বৈচিত্র্য আর সময়ের অদল বদল আমাদের সমাজ সংস্কৃতির সমকালীনতা এবং বিশ্বজনীনতার একখণ্ড চিত্র বহন করবে।

সমাজ মাধ্যমে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং কবি বেলাল চৌধুরী একটি কথোপকথন। সেই কথোপকথনে সুনীল ,মুগ্ধ বিস্ময় বলছেন; সৈয়দ মুজতবা আলীর শব্দচয়ন এবং শব্দ প্রয়োগের কথা। আরবি, ফার্সি শব্দের গহীনে যেভাবে মুজতবা আলী প্রবেশ করতে পেরেছিলেন ,এমনটা সমকালীন বাংলা সাহিত্যের স্রষ্টাদের মধ্যে খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ছিল ফরাসি-সহ বহু ইউরোপীয় ভাষার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব এবং সেসব ভাষায় দক্ষতা।

তাই ভাষাকে এক অদ্ভুত সর্বজনীন রূপ দেওয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষার প্রবাহমান স্রোতকে সৈয়দ মুজতবা আলী সমস্ত ভাষা প্রেমিকের কাছেই একটা চিরকালীন সম্পদ হিসেবে উপস্থাপিত করে গিয়েছেন। আজও বহু মানুষ শব্দচয়নের ক্ষেত্রে মুজতবা আলীর এই আঙ্গিককে অনুসরণ করবার চেষ্টা করেন। মুজতবা আলীর এই শব্দচয়নের একটি অতি সাম্প্রতিক অনবদ্য নিদর্শন হল; পরিমল ভট্টাচার্যের ' সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' নামক উপন্যাস।

এই উপন্যাসে আরবি , ফার্সি , ওলন্দাজ ইত্যাদি ভাষার শব্দগুলির এক অনবদ্য উপস্থাপন আমরা দেখতে পাই। সাম্প্রতিককালের কোনও বাংলা ভাষার সৃষ্টিতে এভাবে ভাষাগত সমন্বয়ে নিদর্শন খুব কম দেখা গেছে। বিশেষ করে যখন, এখন শব্দচয়নের মধ্যে দিয়ে নানা ধরনের সম্প্রদায়িক অভিষ্পা খোঁজবার একটা প্রবণতা কেবল তীব্র হয়ে উঠছে, এইরকম একটা পরিস্থিতিতে, এই উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

ভাষা কোনও বদ্ধ জলাশয় নয়। এদোঁ পুকুর তো নয়ই। ভাষা হল এক স্রোতস্বিনী নদী। যে নদীতে প্রতিদিন সমুদ্রের জোয়ার ভাঁটা খেলে। এই জোয়ার ভাঁটা যেমন নদীকে পরিশুদ্ধ করে। নদীর রূপ বদলায়। তেমনিই প্রতিটি ঢেউয়ের তালে তালে জানান দেয়; বেগমান গতির ছন্দকে ।

ভাষা ঠিক সেই রকমই একটি বিষয়। আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগে উত্তর কলকাতার প্রচলিত যে কথ্য ভাষার প্রচলন, সময়ের নিরিখে সেই রীতির মধ্যে নতুন ঘাত প্রতিঘাত এসেছে। শব্দশৈলীতে , ভাষা শৈলীতে নতুনত্ব এসেছে। কিন্তু পুরনো আঙ্গিকও একেবারে যে হারিয়ে গিয়েছে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারা যায় না।

যদি আমরা দক্ষিণ কলকাতার ভাষাশৈলীর নিরিখগুলো একটু চোখ ফিরিয়ে দেখার চেষ্টা করি ,তাহলে দেখতে পাবো, সেখানে বহু অঞ্চল ভিত্তিক মানুষের বসবাসের দরুন, সেখানকার ভাষার প্রবাহমানতার মধ্যে শব্দ সমন্বয় এবং আঙ্গিক মিশ্রণ, এগুলো একটা অন্যরকম মাত্রা পেয়েছে। 

সেখানে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আঞ্চলিক শব্দাবলী ,সুন্দরবন সন্নিহিত অঞ্চল, সেখানকার আঞ্চলিক কথ্যরীতি, কথা বলবার ভঙ্গিমা-- এই সমস্ত গুলোর সংমিশ্রণে ভাষাগুলো কিন্তু জগাখিচুড়ি হয়ে যায়নি। ভাষা একটা অদ্ভুত শ্রুতি- মাধুর্যের মধ্যে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে নিতে পেরেছে ।

এ যেন ঠিক প্রাণিবিদ্যায় ,গাছের সালোকসংশ্লেষের মত ব্যাপার। এমনভাবেই ভাষা শৈলী আমাদের প্রবাহমানতার পরিমণ্ডলকে পরিপূর্ণ করেছে পরিপুষ্ট করেছে। একটা কথা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, জেলাগুলির ভাষার নানান ছন্দবন্ধন সম্পর্কে। আমাদের বাঙালিদের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু এই ভাষার মাধুর্যের সবথেকে বড় দিক হল; অঞ্চলভিত্তিক বৈচিত্র্য। যেটি বাংলার তথা ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণের মাধুর্যের ভেতর আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আজকের বাংলাদেশ, যা একদিন অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিল। সেখানেও কিন্তু আমরা দেখতে পাই, ভাষা, অঞ্চল নিরিখে নানাভাবে বিবর্তিত হচ্ছে। কখনও কখনও চট্টগ্রাম - কক্সবাজার ইত্যাদি এলাকার ভাষা শুনে, নবীন প্রজন্মের কারুর মনে হতেই পারে, এটা কি আদৌ বাংলা ভাষা ? 

এসব প্রশ্নের উত্তর ভাষাতত্ত্বের মানুষজনেরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দিয়ে আসছেন। কিন্তু যে কথাটা এই ভাষা দিবসের প্রেক্ষিতে আমাদের আবারও স্মরণ করতে হয়, সেটি হল এই যে ; প্রত্যেকটি অঞ্চলেরই ভাষাগত বৈশিষ্ট্য এবং বৈচিত্র্য, তা কিন্তু নানাভাবে সার্বিক বাঙালির মাতৃভাষার ব্যবহারের প্রশ্নে কোনও না কোনও ভাবে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। আমি হয়তো বুঝতেই পারি না , খাঁটি কলকাতায় ভাষা বলে যে শান্তিপুরের ভাষা আমি ব্যবহার করবার চেষ্টা করছি , সেই ভাষার কথ্যরীতিতে কোথায় গিয়ে বরিশালের একটি শব্দ বা কোচবিহারের একটি শব্দ মিলেমিশে নিজেকে একাকার করে দিয়েছে। এভাবেই আমাদের বাংলা ভাষাকে একটা শ্রুতিমাধুর্য দান করেছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের যে চিরকালীন ভাষ্য ভারতের বুকে যুগ যুগ ধরে প্রবাহমান হয়ে রয়েছে, তাকেই আবার চির নতুন করে তুলছে।