অয়ন ভট্টাচার্য 

যে কোনও লম্বা সফর মানেই খিদে! সকলে কি আর সঙ্গে করে খাবার নিয়ে যেতে পারে? যাদের কাজেকম্মে নিয়মিত এদিক ওদিক করতে হয়, সব সময় কি আর বাইরের খাবারে মন বসে? খাবার নিয়ে বাঙালী এমনিতে একটু বেশি উদার, তাই বাইরে গেলেও ঠিক খেয়ে পরে বেঁচে থাকে। কিন্তু নিজের পছন্দের খাবার খোঁজা মোটেই অন্যায় নয়! 

আমাদের দেশের রেল যাত্রায় সকালের জল খাবার মানেই কাঁচা পাউরুটি, ডিমের ওমলেট অথবা নিরামিষ কাটলেট । বাঙালী খাবার বলে কিছু নেই। শীতের সকালে তথাকথিত “প্রিমিয়াম” ট্রেনে কাঁচা পাউরুটি দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে একবার বলেছিলাম, “কড়াইশুটির কচুরি আর শুকনো আলুর দম পাওয়া যাবে?” 

পরিবেশনকারি আকাশ থেকে পড়লেন, “নেহি সাব! কচৌরি ওর পুরি নেহি মিলেগা ..।”

“ ধুর..। পুরি নয় লুচি।” বেজায় দুঃখ পেয়ে বলি ,“ কড়াপাকের নলেন গুড়ের সন্দেশ পাওয়া যায় না কেন অ্যাঁ?” 

আমার দুঃখের উত্তর দেওয়ার দায় নেই কারও। কেন নেই বোঝা গেল পাশের কয়েকজন যাত্রীর হাসাহাসিতে। “ট্রেনে এইসব খেতে ইচ্ছে হলে বাড়ি থেকে নিয়ে আসেনা কেন? অ্যাপে অর্ডার করলেও তো পাওয়া যায়..।” 

ঠিক ঠিক! আমিই ভুল! রেলের খাবার এমনই হয়, এটাই যেন প্রায় আইনসভায় পাশ করা পরম্পরা। মেনে নিয়ে অম্লান বদনে সফরে চলেন সবাই। 

একমাত্র ব্যতিক্রম কোঙ্কন রেলওয়ে পরিচালিত বোম্বে থেকে গোয়া যাওয়ার কয়েকটি ট্রেন। বহু বার বোম্বে থেকে গোয়া গিয়েছি রাতের কঙ্কনকন্যা আর দিনের মান্ডভি এক্সপ্রেসে। চমৎকার পমফ্রেট মাছের তন্দুর পাওয়া যায় ! স্টিলের ডাব্বায় দুর্দান্ত সব খাবার পরিবেশন হয়। কত রকমের পদ! সকালে দোসা, ইডলি , পাওভাজি, আবার সিরা উপমা যেমন, তেমন টেংরি বিরিয়ানী থেকে মারাঠি জুঙ্কা ভাকরি , কোঙ্কনি কোমবারি বড়া , এ ছাড়া চিনে খাবার, সাহেবী খাবার ,আম জনতার খাবার..কতরকম পদ! এই দেশেই একই রকম দেখতে একই ভাড়ার ট্রেনে এত কিছু খেতে খেতে যাওয়া যায় , ভাবলেই হিংসে হয় সত্যি! 

একবার গোয়ার ট্রেনে এক বাঙালী কর্মচারীকে পেয়েছিলাম। আবদার করেছিলাম, “ ভেটকি মাছ না থাক বাসা মাছের ফিস ফ্রাই বা পাতুরি তো বানাতে পারো ভাই!” “দাদা আপনারা লিখুন না সবাই মিলে, কত বাঙালী যায় এই ট্রেনে কিন্তু বাংলার মেনু নেই। আমাদেরও ভালো লাগবে যদি সকালে লুচি বেগুন ভাজা , ছোলার ডাল , বোঁদে খাওয়াতে পারি।” 

নিজের ভাষার খাবারের নামের মধ্যেও কত আনন্দ আছে! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনুতে পাও ভাজি আর বড়া পাও আর গরম গুলাব জামুন দেখতে থাকি। 

বাঙালী আকাশ যাত্রা করলে কখনই “বিমানবন্দর” যায় না। “এয়ারপোর্ট” যায়। বিমান বা উড়োজাহাজ নয়, প্লেনে চেপে যাওয়া। বিমানে যাত্রা শুরুর আগে ঘোষণা করা হয়, হিন্দী ও ইংরেজিতে আপনার সেবার জন্য যাঁরা আছেন তাঁরা হিন্দী, ইংরেজি, ছাড়াও কেউ বাংলা, কেউ নেপালী, কেউ অহমিয়া, কেউ তামিল বলতে পারেন। তবে ওইটুকু! আকাশে কেউ মাতৃভাষা বলতে চায়না। একবার বিমানে উঠে বেজায় খিদে পেয়েছে। সস্তার বিমানে আলাদা করে খাবার কিনতে হয়। টিকিটের সঙ্গে আগে থেকে যুক্ত না থাকলে দামও হয় পেল্লায়। যাক গে খিদে পেলে কি আর করা যাবে। খিচুড়ির ছবি দেখাচ্ছে মেনুতে , ডাকলাম বিমানসেবিকাকে, “ এই খিচুড়ি পাওয়া যাবে?” 

“দিস ইজ ডাল চাওল স্যর। রেডি টু ইট।”

“ডাল চালই তো খিচুড়ি..খালি একটু ঘি মেশালে..।” 

“ইটস ডাল চাওল স্যর.. নট লাইক আওয়ার বেঙ্গলি খিচুড়ি..।”

“খিচুড়ির মত ছবি দেওয়া তো তাই ভাবছি।” 

বিমান সেবিকার নাম দেখলাম সংযুক্তা। সে তখন হেসে ফেলেছে। বাংলায় বলল “ বাড়ির খিচুড়ির মত খেতে নয় কিন্তু..ঘি পাবেন না।”

“আচ্ছা তাই সই। বাড়ির মত না হোক, খিচুড়ি তো.. নিয়ে আসুন।” 

আমার দেখে পাশের সহযাত্রী , যিনি এর আগে তেষ্টা মেটাতে দু বার ড্রিঙ্কিং ওয়াটার চেয়েছিলেন, বেমালুম বাংলায় বললেন, “ আমাকেও তাহলে খিচুড়ি দেবেন তো, আর আলাদা একটা নুনের প্যাকেট।” 

এরপর “ব্ল্যাক টি” অ্যান্ড “মশালা চায়ে” ছত্রিশ হাজার ফুট উপরে নাম পাল্টে আমার জন্য “লাল চা” আর সহযাত্রীর “ দুধ চা” হয়ে গেল। “কুকিজ” হয়ে গেল “ বিস্কুট”। বাঙালী বিস্কিট কক্ষনো বলেনা, ওই হ্রস্ব উ কার যুক্ত হলেই বাংলা হয়ে গেল যে!

গরম জল ঢালা সেই ডাল চাওল অতি অখাদ্য। অতিরিক্ত দাম দিয়ে অখাদ্য খাওয়ায় জ্বালা একটু মিটল আকাশ পথে মাতৃভাষায় খাবার চাইতে পারছি এই সামান্য এক আমোদে । যদিও বিমানের খাবারের স্বাদে গন্ধে কোনও ভাষা সংস্কৃতির ছোঁয়া নেই। ভারতীয় বিমান সংস্থাদের বয়ে গেছে এইসব নিয়ে চিন্তা করার। তারা লোকসান কমাতে গিয়ে এখন গলদঘর্ম।

বিমানে সত্যি বাংলায় মেনু কার্ড পেয়েছিলাম দুবাই যাত্রার সময়। ফ্লাই এমিরেটস এর কলকাতা থেকে দুবাই উড়ানে বাংলা ভাষায় ছাপানো মেনু কার্ড দেওয়া হয়। সেইখানে আবার লেখা ছিল, - আলু ফুলকপির তরকারী, বাঙালী ঘরানার মাংস (মাটন কারি) , চিংড়ি বিরিয়ানী, রসগোল্লা - আবার সব খাবারের একটা পরিচিতি দেওয়া সেই লম্বা সুদৃশ্য মেনু কার্ডে। না দেখলে বিশ্বাস হত না। এমিরেটস এর বিমানবালারা এমনিতেই এক একজন প্রায় বেহেশতের হুর , তার সঙ্গে বাংলায় লেখা মেনু , খাবার আরো বেশী উপাদেয় হয়ে গেল। 

খিদে পেলে অনেক সময় ভাষা কোনও বালাই হয় না। ইম্ফলে একবার আটকে পড়েছি হুট করে ডাকা লম্বা বনধে। বনধ আর আটকে পড়া মণিপুরের মানুষদের যেন ভবিতব্য। ইচ্ছা হচ্ছে ভাত খাব। শুনশান রাস্তায় মিলিটারি টহল। এর মধ্যে এক জায়গায় বাংলা লিপিতে লেখা “ চাক ফং ইয়ানি”। মেইতেই ভাষার লিপি বাংলায়, যার মানে হচ্ছে. “এখানে ভাত পাওয়া যায়।” মনটা কেমন শান্ত হল। উচ্চারণ ভিন্ন, লিপি আমি পড়তে পারছি। এই শব্দবন্ধ আমার পরিচিত। নিশ্চিন্তে সেই জায়গায় তাহলে ঢোকা যাবে! ভাষা তখন বাধা নয়। আমার পরিচিত লিপি ওই অশান্ত শহরেও যেন আমাকে ভরসা দিল, এখানে ভাত পাবো..যাক!

অসমে রাস্তার ধারে যেমন বাংলা লিপি দেখলে পড়ে পড়ে দেখি । ব- এর পেট কাটা। “হ” আর “চ” এর ব্যবহার দেখে একটু থমকে আবার পড়তে শুরু করতে হয়। নাহ্ ভাষার উৎস আর প্রবাহ নিয়ে তত্ত্বকথা ঘেঁটে লাভ নেই। ভাষাটা যে প্রায় এক এইটা বোঝার জন্য খুব মাথা না ঘামালেও চলে। তাই এখানে হিন্দু হোক কী ইসলাম, পানীয় জল সকলের কাছেই, “খোয়া পানি”। কিন্তু ভাত সেই, “ভাত”, চাল হল সেই “ধান”। দুধ “গা ক্ষীর”, ডিম “কনি” হলেও চা সেই “চা বা সা”। রাস্তা , বাজার, দোকান, বাস, সাইনবোর্ড দেখে কেমন ভালই লাগে, আরে এ যে প্রায় আমাদেরই, একটু অন্যরকম, কিন্তু এ তো প্রায় বাংলাই। আলাদা ভাবলেই অন্য, কাছে টানলেই সবাই আমারই! 

তবে ভাষার রকমফের খাবারকে বদলে দেয়। সেই নিয়ে আবার ভিন্ন অভিজ্ঞতাও হয়েছে। একবার গাড়ি নিয়ে উত্তর বিহারে চলেছি। এক জায়গায় চা পান করতে থামার পর ড্রাইভার বলল, “সিঙ্গাড়া লেনা হ্যায় সাব? একদম তাজা?” 

চায়ের সঙ্গে সিঙ্গাড়া , হ্যাঁ বেশ তো , নিয়ে এসো ভাই। সে নিয়ে এল ঠোঙা করে। হাতে নিয়ে দেখি একদম তাজা পুরুষ্টু তিন কোনা একরাশ পানি ফল! বোঝো, এর নাম তাহলে সিঙ্গাড়া! 

আর একবার লম্বা সফরে ভুটান গিয়েছি। কাজের সুত্রে গিয়েছিলাম থিম্পু থেকে একটু দূরে। ফেরার পথেই রাস্তায় তুষারপাত শুরু হল। ঠান্ডা জবরদস্ত। এমন হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় রসিক মানুষরা স্থানীয় ওয়াইন কিংবা কড়া কিছু পানীয় খোঁজ করে । আমাদের সঙ্গে ততক্ষনে যোগ দিয়েছে স্থানীয় দুই ভুটানি বন্ধু ওয়াংদি আর তার ভাই। রসিক দলের মধ্যে একমাত্র বেরসিক আমি। মেনু কার্ড ঘাঁটতে ঘাঁটতে “ফিস ফ্রাই” দেখে অন্তরের বাঙালী সত্ত্বা জেগে উঠল। “ফিস ফ্রাই” কে অনেকদিন আমরা একবারে নিজের করে নিয়েছি, ভেটকি মাছের ফিলে তার ওপর মুচমুচে পরত , সঙ্গে কাসুন্দি। সাহেবদের “ফিস এন্ড চিপসের” বাংলা সংস্করণ। এর কোনও বাংলা নাম নেই, “ফিস ফ্রাই” উচ্চারণ হলেই চোখে ভেসে ওঠে মিত্র ক্যাফে , বিজলি গ্রিল থেকে আমাদের পাড়ার বলাইদার সেই সোনালী লম্বাটে হীরের আকারের বাইরে মুচমুচে ভিতরের পরতে পরতে ভেঙে যাওয়া ভেটকি মাছের “আহা” স্বাদ! 

মেনুতে এক প্লেটে দেখাচ্ছে আট পিস ফিস ফ্রাই! এই ঠান্ডায় জব্বর জমবে ভেবে হাঁকা হল। 

“ বেঙ্গলি স্টাইল ফিস ফ্রাই হবে তো?”

ঘাড় নেড়ে এক ভুটানি সুন্দরী বললেন, “দিস ইজ বেঙ্গলি ফিস ফ্রাই স্যর।” 

আচ্ছা তাহলে এক প্লেট দেখা যাক। এবং এসেও গেল অল্প সময়েই। হাসি মুখের সেই ভুটানি তনয়া প্লেটে করে নিয়ে এল আটটি কাতলা মাছ ভাজা! “ফিস ফ্রাই” এক্কেবারে সঠিক অর্থে! ভুটিয়া ঝাল লঙ্কার আচার চাখতে গিয়ে এ দিকে একজনের সঙ্গীন অবস্থা ,হেঁচকি তুলতে তুলতে সে প্রায় তেড়ে বলল, “ওরে এতো কাতলা মাছ ভাজা! ফিস ফ্রাই নয়?” 

এ দিকে ওয়াংদি মাছ ভাজায় কামড় দিয়ে বলছে , “দিস ইজ বেঙ্গলি ফিস ফ্রাই। আই লাভ ফিস..।”

বোঝো! বাংলায় মাছ ভাজা আর ফিস ফ্রাই দুটি আলাদা বস্তু অন্তত আমাদের মনের ভাষায়। এই কাতলা মাছ এসেছে ভারত থেকেই, ওদের কাছে এটা বাংলার মাছ ভাজা! 

আমি বললাম, “যাই হোক কাতলা মাছ গরম গরম ভাজা একটু ভাত আর ডাল দিয়ে জমবে খুব..।” 

সেই ব্যবস্থাই হল, ভুটানি লাল ঢেঁকি ছাঁটা চাল, সঙ্গে গরম গরম ডাল, চিজ, সবজি , মাশরুম দিয়ে বানানো ভুটানি “এমা দাতশি” আর কাতলা মাছ ভাজা! চরম ঠান্ডা আর ভুটিয়া লঙ্কার ঝাল সামলে অভিনব এক “ফিউশন” খাবার চেটেপুটে সবাই খেল সেদিন। আধা হিন্দী, আধা ইংরেজি, গোটা বাংলা আর না বোঝা ভুটিয়া ভাষায় জোরদার আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া চলতে লাগল। মানুষ যখন এক টেবিলে খেতে বসে, একজন আরেকজনের খাবার ভাগ করে খায় , ভাষা আর খাবার নিয়ে কোনও সমস্যাই আর হয় না। মিলে মিশে যেতে চাইলে ভাষা হোক আর খাবার তখন মনের মধ্যে এক। ভিন্ন ভাবনা আর সংস্কৃতির শীতল দুরত্ব ঠিক সম্পর্কের ওম হয়ে সব খিদে মিটিয়ে দেয়।