আজকাল ওয়েবডেস্ক: সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে এক অবিশ্বাস্য কাহিনী। ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলের মেকেলে শহরের ৭৬ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা, মেধিন হাগোস, সম্প্রতি এক সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিরিখে এই ঘটনা যতই অসাধ্য সাধন বলে মনে হোক না কেন, তার চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বৃদ্ধার বয়স। বার্ধক্য, যৌনতা এবং প্রৌঢ় বয়সে মাতৃত্ব নিয়ে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন মনোভাব এক লহমায় প্রকাশ্যে চলে এসেছে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সমাজবিদদের মতে ঘটনাটি শুধু এক জন মহিলার ব্যক্তিগত যাত্রার আখ্যান নয়, বরং এই সংক্রান্ত আলোচনা এক সামাজিক আয়নাও বটে। যা দেখিয়ে দেয় কীভাবে ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি সর্বসমক্ষে কাটাছেঁড়া হয় এবং তাকে ঘিরে নীতি-পুলিশি ও রাজনীতি শুরু হতে পারে।
বৃদ্ধার দাবি, ১৯৮০-র দশকে এক বার প্রাকৃতিক ভাবে গর্ভপাত হয় তাঁর। তারপর থেকে দশকের পর দশক চেষ্টা করেও নিঃসন্তান থেকে গিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বাল্যবন্ধুর সহায়তায় গর্ভধারণ করতে সক্ষম হলেন তিনি। ইথিওপিয়ার মতো রক্ষনশীল দেশে, নিঃসন্তান থাকাকে একাধারে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত লজ্জার বিষয় বলে মনে করা হয়। সেখানে স্থানীয় পাদ্রি-সহ অনেকেই তাঁর এই গর্ভধারণকে ‘ভগবানের আশীর্বাদ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু এর বিরুদ্ধ মতও রয়েছে। অন্য দিক থেকে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। সমালোচকদের কটাক্ষ এই বয়সে এক জন মহিলা কীভাবে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারেন? এটা কি আদৌ নৈতিক? সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং নীতিহীনতার অভিযোগের বন্যা বয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন: শুক্রাণু দান করে কত টাকা আয় হয়? ভারতে বীর্য দাতা হতে গেলে কোন কোন নিয়ম জানতে হবে?
আরও পড়ুন: বিমান দুর্ঘটনায় মরেননি, জেতেন ৫ কোটির লটারি! সাতবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা বিশ্বের সবচেয়ে ‘লাকি’ ব্যক্তি ইনি
এই অবস্থা অবশ্য শুধু ইথিওপিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বেশি বয়সে মা হওয়া নিয়ে সমাজের একাংশের আপত্তি বহু দেশেই রয়েছে। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ৭০-এর কোঠায় মা হওয়া বহু মহিলার ঘটনা (তা সে আইভিএফ পদ্ধতিতেই হোক বা স্বাভাবিক গর্ভধারণের মাধ্যমে হোক) সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে রয়েছে, ভারতের দলজিন্দর কৌর (৭২) এর ঘটনা। আইভিএফ পদ্ধতিতে ৭২-এ মা হন তিনি। কিন্তু এই বয়সে চিকিৎসার ঝুঁকি উপেক্ষা করার জন্য সমালোচিত হন তিনি। রোমানিয়ার আদ্রিয়ানা ইলিস্কু মা হন ৬৬তে। পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমের একাংশ তাঁকে ‘ঠাকুমা-মা’ আখ্যা দেয়। তাঁর সিদ্ধান্তকে হয় চরমপন্থী নারীবাদী পদক্ষেপ এবং চিকিৎসার বিকৃতি হিসেবেও দেখানো হয়। ভারতেরই আরও একটি ঘটনায় এরামাত্তি মঙ্গায়াম্মা (৭৪) বছর বয়সে যমজ সন্তানের জন্ম দেন। তার পরেই শুরু হয় নীতিপুলিশি। ‘মাতৃত্বের অধিকার’ বনাম ‘স্বার্থপরতা’ নিয়ে ফের শুরু হয় বিতর্ক। প্রতিটি ঘটনাই একটিই সত্যকে তুলে ধরে, বয়স্ক মহিলাদের স্বাধীনতার সঙ্গে নারীত্ব, যৌনতা এবং মাতৃত্বের ‘সঠিক সময়’ নিয়ে সমাজের গভীরে প্রোথিত থাকা কট্টরপন্থী ধারণা এখনও সমাজে বর্তমান।
তবে এই ধরনের ঘটনাকে সংবাদমাধ্যম কীভাবে পরিবেশন করে, তাও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে। ইথিওপিয়ার মতো দেশ, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা হয়, সেখানে সংবাদ শিরোনামে পিতৃতান্ত্রিক অনুশাসনের ঊর্ধ্বে উঠে বিষয়টির প্রশংসাই করা হয়েছে। তবে সেটি করতে হয়েছে ধর্মীয় আবরণের মোড়কে। বিষয়টিকে সামাজিক স্বীকৃতি দিতে ‘অলৌকিক’ বা ‘দৈব আশীর্বাদ’ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাল মিলিয়েছেন সে দেশের নেটিজেনরাও। এই প্রসঙ্গে এক টিকটকার মন্তব্য করেছেন, “দেখুন ঈশ্বর কী অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়েছেন... বিজ্ঞান যেখানে বলে দিয়েছিল যে এই মহিলার সন্তানধারণের বয়স পেরিয়ে গিয়েছে, তার পরেও তিনি মা হলেন। ঈশ্বর মহান, তিনি বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে।” স্থানীয় টাইগ্রিনিয়া এবং আমহারিক ভাষার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যেও ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের প্রশংসা করে একই ধরনের মন্তব্য দেখা গিয়েছে।
