আজকাল ফিট থাকা এবং পেশিবহুল সুঠাম চেহারার অধিকারী হওয়া— দুই প্রজন্মের কাছেই এক মস্ত ট্রেন্ড। ভোর হোক বা সন্ধে, শহরের অলিগলির জিমে ভারী ওজন তোলা আর ট্রেডমিলে ঘাম ঝরানোর হিড়িক চোখে পড়ার মতো। নিয়মিত জিমে গিয়ে কসরত করলে কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, এ কথা যেমন একশো ভাগ সত্যি, তেমনই এর উল্টো পিঠের এক ভয়ঙ্কর বাস্তব ইদানীং কড়া নাড়ছে আমাদের দরজায়। সুস্থ-সবল যুবকদের হঠাৎ জিমে ওয়ার্কআউট করতে করতে হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যুর খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে।

কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? লোহা পিটিয়ে শরীরকে লোহার মতো শক্ত করতে গিয়ে কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে মানুষের হৃদযন্ত্র? চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত শারীরিক চাপ বা শরীরে লুকিয়ে থাকা কোনো হৃদরোগের কারণেই এই জিম যেন অনেক সময় সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


বিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টদের মতে, যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা ধমনীতে ব্লকেজ থাকে, তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ ভারী ব্যায়াম রক্তচাপ মারাত্মক বাড়িয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মূলত ৫টি প্রধান কারণে জিমের ভেতরে এই ‘সাইলেন্ট কিলার’ থাবা বসায় -


১. লুকিয়ে থাকা ‘নীরব’ হৃদরোগ (Silent Heart Disease): আমাদের মধ্যে অনেকেরই শরীরে সাইলেন্ট করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা জন্মগত হার্টের সমস্যা থাকে, যা সাধারণ অবস্থায় টের পাওয়া যায় না। কিন্তু জিমে গিয়ে যখনই হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত ধকল ফেলা হয়, তখনই সেই লুকানো রোগটি মারাত্মক রূপ ধারণ করে।

২. ওয়ার্ম-আপ ছাড়া হঠাৎ ভারী ওজন তোলা (Overexertion): শরীরকে প্রস্তুত না করেই হঠাৎ তীব্র এক্সারসাইজ বা নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে ভারী ওজন তোলা শুরু করলে হৃদপিণ্ডের পেশির ওপর আচমকা বিপুল চাপ পড়ে।

৩. সাপ্লিমেন্ট ও স্টেরয়েডের মারণ কামড়: জিমে বডি বানানোর শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে গিয়ে অনেকেই প্রাক-ওয়ার্কআউট সাপ্লিমেন্ট (Pre-workout supplements) বা ক্ষতিকারক স্টেরয়েড নেন। এগুলো সাময়িকভাবে এনার্জি বাড়ালেও হার্ট রেটকে অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়, যা হার্ট অ্যাটাক ট্রিগার করার জন্য যথেষ্ট।

৪. জলশূন্যতা (Dehydration): ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যায়ামের ফলে অতিরিক্ত ঘাম হয়ে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় খনিজ ও সোডিয়াম-পটাশিয়ামের মতো লবণ বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স নষ্ট হয় এবং হৃদস্পন্দন (Heart Rhythm) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

৫. অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সঙ্গে জিমিং-এর ককটেলে বিষ: যারা নিয়মিত ধূমপান করেন কিংবা যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের রক্তনালীগুলো এমনিতেই ভেতরের দিক থেকে শক্ত ও সরু হয়ে থাকে। এই অবস্থায় জিমের অতিরিক্ত ধকল বা স্ট্রেস যুক্ত হলেই রক্তনালী ফেটে বা ব্লক হয়ে হার্ট অ্যাটাক ঘটে।


জিমে যাওয়া বা শরীরচর্চা করা কোনও অপরাধ নয়, বরং তা সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। তবে তা করতে হবে সঠিক বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে। জিমে নাম লেখানোর আগে চিকিৎসকরা কয়েকটি গোল্ডেন রুল মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন:

১. আগে সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Cardiac Check-up):
কোনও নতুন জিম রুটিন বা ভারী ব্যায়াম শুরু করার আগে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ট্র্যাডমিল টেস্ট (TMT) বা ‘২ডি ইকো’ সহ সার্বিক কার্ডিয়াক হেলথ চেক-আপ করিয়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে আপনার পরিবারে যদি হার্টের রোগের ইতিহাস থাকে, তবে এই পরীক্ষা ছাড়া জিমে পা রাখা আত্মহত্যার শামিল।

২. ওয়ার্ম-আপ ও কুল-ডাউন:
ওয়ার্কআউট শুরুর আগে অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট হালকা স্ট্রেচিং বা কার্ডিও করে শরীর ও হার্টকে গরম (Warm-up) করে নিন। আবার ব্যায়াম শেষ করেই হুট করে জিম থেকে বেরিয়ে যাবেন না, শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরাতে ‘কুল-ডাউন’ এক্সারসাইজ করুন।

৩. কচ্ছপের গতিতে শুরু করুন:
প্রথম দিনই জিমে গিয়ে সলমন খান বা হৃতিক রোশন হওয়ার চেষ্টা করবেন না। নিজের বর্তমান ফিটনেস লেভেল অনুযায়ী ব্যায়াম শুরু করুন। ধীরে ধীরে ট্রেনারদের তত্ত্বাবধানে ব্যায়ামের তীব্রতা বা ওজনের পরিমাণ বাড়ান।

৪. পর্যাপ্ত জল ও ওআরএস :

ব্যায়ামের সময় ও পরে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন। প্রয়োজনে জলের সাথে ইলেকট্রোলাইট পাউডার বা ওআরএস মিশিয়ে খেতে পারেন, যাতে শরীরে লবণের ঘাটতি না হয়।

৫. শরীরের সংকেতকে অবহেলা নয়:

আপনার শরীর আপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষক। ব্যায়াম করার সময় বুকে সামান্যতম অস্বস্তি বা চাপ লাগা, অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, চোয়ালে ব্যথা কিংবা অস্বাভাবিক ঠান্ডা ঘাম দেখা দিলে অহঙ্কার ঝেড়ে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম থামিয়ে দিন। বিশ্রাম নিন এবং প্রয়োজনে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান।

মনে রাখবেন, সিক্স প্যাক অ্যাবস বা চওড়া ছাতির চেয়ে আপনার বুকের ভেতরে সচল থাকা হৃৎপিণ্ডটার দাম অনেক বেশি। তাই হুজুগে মেতে নয়, সচেতন হয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শরীরচর্চা করুন।