আমাদের শরীরে মাঝেমাঝেই হাত, পা বা মুখ ফুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। অনেকে একে সাধারণ ক্লান্তি বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফল মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'এডিমা'। সহজ কথায়, যখন আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষ বা টিস্যুর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় অতিরিক্ত তরল বা জল জমে যায়, তখনই সেই অংশটি ফুলে ওঠে।
যদি এই ফোলা ভাব প্রায়ই দেখা যায় এবং অনেকদিন ধরে থাকে, তবে তা শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনও বড় রোগের লক্ষণ হতে পারে। তাহলে কোন কোন গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে শরীরে এমন ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে, জেনে নিন-
১. হার্টের সমস্যা বা হার্ট ফেইলিওরঃ আমাদের হার্ট বা হৃদযন্ত্রের মূল কাজ হল সারা শরীরে রক্ত পাম্প করা। কিন্তু হার্ট যখন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঠিকমতো রক্ত সঞ্চালন করতে পারে না, তখন রক্ত চলাচলের গতি ধীর হয়ে যায়। কেন ফোলা ভাব হয়? রক্ত ঠিকমতো ফিরে আসতে না পারায় শিরাগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। ফলে রক্ত থেকে তরল অংশ বের হয়ে মূলত পায়ের পাতা, গোড়ালি এবং নিচের অংশে জমা হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠা, শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং সবসময় বুক ধড়ফড় করার মতো লক্ষণ হতে পারে।
২. কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়াঃ কিডনি হল আমাদের শরীরের ছাঁকনি। এটি রক্ত থেকে অতিরিক্ত জল, নুন এবং ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিডনি যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে শরীরে অতিরিক্ত নুন (সোডিয়াম) এবং জল জমতে থাকে। এই বাড়তি তরল হাত ও পায়ে জমে যায়। এছাড়া কিডনির সমস্যার কারণে শরীর থেকে জরুরি প্রোটিন বেরিয়ে গেলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশ এবং মুখ মারাত্মকভাবে ফুলে উঠতে পারে। অন্যান্য লক্ষণ হতে পারে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা ফেনা হওয়া, খিদে কমে যাওয়া এবং বমি বমি ভাব।
৩. লিভারের মারাত্মক রোগঃ অতিরিক্ত মদ্যপান, হেপাটাইটিস সংক্রমণ বা ফ্যাটি লিভারের কারণে দীর্ঘদিন ধরে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে একসময় তা শক্ত হয়ে যায়, যাকে 'লিভার সিরোসিস' বলে। কেন ফোলা ভাব হয়? সুস্থ লিভার 'অ্যালবুমিন' নামক একটি বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে। এই প্রোটিনটি রক্তনালীর ভেতরে তরল ধরে রাখতে সাহায্য করে যাতে তা বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে। লিভার নষ্ট হলে অ্যালবুমিন তৈরি কমে যায়, ফলে তরল রক্তনালী থেকে চুঁইয়ে চারপাশের টিস্যুতে চলে আসে। এর কারণে পায়ে ফোলা ভাব তো হয়ই, পাশাপাশি পেটের ভেতরে প্রচুর জল জমে পেট ঢাকের মতো ফুলে ওঠে। জন্ডিস, চরম ক্লান্তি এবং লিভারের অংশে ব্যথা হতে পারে।
৪. পায়ের শিরার দুর্বলতাঃ আমাদের পায়ের শিরাগুলোর ভেতরে ছোট ছোট একমুখী 'ভালভ' বা দরজা থাকে। এই ভালভগুলোর কাজ হল মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পায়ের রক্তকে ওপরের দিকে, অর্থাৎ হার্টের দিকে ঠেলে পাঠানো। কেন ফোলা ভাব হয়? বয়স বাড়ার কারণে বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার ফলে এই ভালভগুলো দুর্বল বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন রক্ত ওপরের দিকে উঠতে না পেরে পায়েই জমতে শুরু করে। এই জমে থাকা রক্তের চাপে তরল পদার্থ শিরার দেওয়াল ভেদ করে পায়ের মাংসে ছড়িয়ে পড়ে এবং পা ফুলিয়ে দেয়। পায়ে ভারী ভাব, পায়ের শিরাগুলো নীলচে ও আঁকাবাঁকা হয়ে ফুলে উঠতে পারে।
শরীরে ঘনঘন ফোলাভাব দেখা দিলে নুন খাওয়া সাময়িকভাবে কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে, তবে এটিকে হালকাভাবে নেওয়া একদমই উচিত নয়। নিজে নিজে কোনও ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। এমন সমস্যা নিয়মিত হলে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তের পরীক্ষা, কিডনি ও লিভার ফাংশন টেস্ট এবং ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রাম করানো অত্যন্ত জরুরি।















