পরমা দাশগুপ্ত
মেয়ের হাতে পুতুল আর ছেলের হাতে ব্যাটবল— চেনা সমীকরণটা বদলাচ্ছিল আগেই। বাঙালির ঘরে ঘরে ছেলেকে আগামীর শচীন তেন্ডুলকর করে তোলার স্বপ্নটায় মেয়েদের ভাগ বসানোর পালা শুরু করে দিয়েছিলেন ঝুলন গোস্বামী, মিতালী রাজেরা। সদ্য স্মৃতি মন্ধানা-জেমাইমা রডরিগসদের সাফল্য ঘিরে দেশজোড়া উচ্ছ্বাস বুঝিয়ে দিয়েছে ছবিটা সত্যি সত্যি পাল্টে গিয়েছে অনেকটা।
শুধু তা-ই নয়, ‘চক দে ইন্ডিয়া’র হাত ধরে হকি, সানিয়া মির্জার দেখাদেখি টেনিস নিয়েও আগ্রহ বেড়েছে মেয়েদের শেখা বা শেখানোর ক্ষেত্রে। আর শীতের মরসুমে সময় কাটানো থেকে পিকনিক— ব্যাডমিন্টন ঘিরে বাঙালির ভালবাসা বরাবরই অকৃত্রিম। পাশাপাশি, ইদানীং শারীরিক সুস্থতা এবং ফিটনেস নিয়ে সচেতনতা যত বাড়ছে, অনেকেই ঝুঁকছেন নানা ধরনের খেলাধুলোর দিকে। তাল মিলিয়ে ক্রিকেট, টেনিস, ব্যাডমিন্টন-সহ বিভিন্ন আউটডোর স্পোর্টস শেখার সুযোগও বাড়ছে কলকাতায়। বাড়ছে এসবের প্রশিক্ষণের চাহিদাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়েদের ক্ষেত্রে আউটডোর স্পোর্টস শেখার শুরুটা হওয়া উচিত ৮-১২ বছর বয়সের মধ্যেই। এ সময়টায় শরীর নমনীয় থাকে, ফিটনেস বাড়িয়ে শক্তপোক্ত হয়ে ওঠার ক্ষমতাও থাকে বেশি।
শেখার চাহিদার নিরিখে যদিও এখনও ক্রিকেটেরই পাল্লা ভারী। যার নেপথ্যে ক্রিকেট ঘিরে তুমুল উন্মাদনা, সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতাকে নম্বর দিতেই হয়। এ শহরে তাই মেয়েদের ক্রিকেট কোচিংয়ের সুযোগ রয়েছে যথেষ্টই। বিভিন্ন ক্লাব এবং অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে পারে মেয়েরা। তার হাত ধরেই নানা ধরনের ক্লাব টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ মিলে যায়। আন্তঃ কলকাতা এবং তার পরে আন্তঃ রাজ্য বা জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতাগুলোর দরজা খুলে যেতে পারে সেখান থেকেই। মোটামুটি ভাবে অ্যাকাডেমির মান, প্রশিক্ষণ নিতে আসা মেয়েটির দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের ধরনের উপর নির্ভর করে মাসিক খরচ ঘোরাফেরা করে মাসিক হাজার দেড়েক থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়াও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইদানীং বিভিন্ন অফিস বা বড় আবাসন কমপ্লেক্সগুলোয় মেয়েদের ক্রিকেটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। শীতের মরসুমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন সেক্টরের বড় সংস্থাগুলো মহিলা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। তাতে যোগদানের উৎসাহ এবং সাফল্য ঘিরে উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। তেমনই শহর ও নানা প্রান্তে বিভিন্ন হাউজিং কমপ্লেক্সে ক্রিকেটের আসরে হইহই করে অংশ নেনে আবাসিক নানা বয়সের মেয়ে ও মহিলারা। রীতিমতো উত্তেজনায় ফুটতে থাকে সবক’টা দলই।
ক্রিকেটের পরে আসা যাক টেনিসে। বাঙালি কন্যের সানিয়া মির্জা হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবের চেহারা দিতে কলকাতার নানা জায়গাতেই মেয়েদের টেনিস শেখার সুযোগ রয়েছে। বড় অ্যাকাডেমিও যেমন আছে, তেমন স্থানীয় স্তরে পাড়ার ক্লাবগুলোতেও মিলে যায় প্রশিক্ষণের সুযোগ। মোটামুটি মাসিক দেড় থেকে তিন হাজার টাকা খরচে টেনিস শেখা সম্ভব এ শহরে। শুধু মেয়েকে টেনিসে পারদর্শী করে তোলাই নয়, ফিটনেসের দিকটা নিশ্চিত করতে নানা বয়সের মহিলারাও নাম লেখান টেনিস কোচিংয়ের খাতায়। আছে ক্যাম্প বা ছোট-বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগও। তবে ফান্ডের অভাবে এখনও কলকাতার খেলার দুনিয়ায় ততটাও পোক্ত জমি তৈরি করতে পারেনি মেয়েদের টেনিস।
পিভি সিন্ধুর মতো কেরিয়ার তৈরির স্বপ্নে তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও ফিটনেস বজায় রাখার দিক থেকে ব্যাডমিন্টন এখনও বাঙালি মেয়েদের পছন্দের খেলা। ফলে কলকাতায় বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি অ্যাকাডেমির পাশাপাশি বহু পাড়াতেই ক্লাবে ব্যাডমিন্টন খেলা বা প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। নানা বয়স বা দক্ষতার নিরিখে সেখানে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। একাধিক স্কুলেও ব্যাডমিন্টন শেখার ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুল-কলেজ সহ ক্লাব স্তরে মেয়েদের জন্য বিভিন্ন ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট হয় এ শহরে। তার থেকেই খুলে যায় বড় মাপের প্রতিযোগিতায় সুযোগ পাওয়ার পথ। মেয়েকে পাঠাতে চান কিংবা নিজেই শিখতে চান ব্যাডমিন্টন? মাসিক ৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় গ্রুপভিত্তিক প্রশিক্ষণে নাম লেখাতে পারবেন সহজেই।
মহিলাদের হকি নিয়েও এ শহরে বেশ খানিকটা আগ্রহের দেখা মেলে। ফলে কলকাতার নানা জায়গাতেই স্থানীয় স্তরে ছোট-বড় অ্যাকাডেমি রয়েছে, রয়েছে ক্লাবের প্রশিক্ষণ। সে সবের হাত ধরে মহিলাদের বয়স-ভিত্তিক হকি লিগে অংশ নেওয়া যায়। তবে শেখার সুযোগ তুলনামূলক ভাবে কম বলেই প্রশিক্ষণের খরচ খানিকটা বেশি এখনও। মোটামুটি ভাবে মাসিক চার থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে ফি-র অঙ্ক। তবে ঘণ্টা ভিত্তিক খরচেও প্রশিক্ষণেরও সুযোগ আছে কিছু ক্লাবে। সে ক্ষেত্রে ঘণ্টা পিছু খরচ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।
এ ছাড়াও ফিটনেসের প্রয়োজনে হ্যান্ডবল, বাস্কেটবলের মতো খেলার ক্রমে চাহিদা আর আগ্রহ দুটোই বাড়ছে কলকাতার মেয়েদের। ফলে একদিকে যেমন তার প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তেমনই প্রতিযোগিতার দিকেও ঝুঁকছে এ শহর। তবে সবার আগে বুঝে নিন, কোন খেলাটা আপনার মেয়ের মনের মতো। কিংবা নিজের ফিটনেসের প্রশ্নে কোন খেলাটা খেলতে আপনার ভাল লাগবে। তবেই কিন্তু মাঠে তৈরি হবে স্বপ্নের মুহূর্তরা।
