পৃথিবীতে মাঝেমধ্যে এমন কিছু অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে, যা কল্পবিজ্ঞানের গল্পকেও হার মানায়। ২০১৯ সালে হংকং থেকে সামনে আসা এমনই এক ঘটনা পুরো চিকিৎসা জগৎকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এক সাধারণ মহিলা সকালের আর পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে টয়লেটে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যখন বাথরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরোলেন, তখন তাঁর জীবনের শেষ ১০ বছরের সমস্ত স্মৃতি মাথা থেকে বেমালুম গায়েব!
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের স্বামী, সন্তানদের দেখেও চিনতে পারলেন না তিনি। এমনকি নিজের চেনা ঘর-বাড়ি দেখেও আঁতকে উঠে বারবার প্রশ্ন করতে লাগলেন, "আমি কোথায়? এই অচেনা মানুষগুলোই বা কারা?" কোনও চোট-আঘাত নেই, কোনও বড় অসুখ নেই— অথচ চোখের পলকে একটা মানুষ কীভাবে ১০ বছর আগের অতীতে হারিয়ে গেলেন, তা নিয়ে আজও চর্চা চলে নেটপাড়ায়।
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাকি দিনগুলোর মতোই স্বাভাবিক কাজকর্ম করছিলেন ওই মহিলা। আচমকা পেটে সামান্য অস্বস্তি অনুভব করায় তিনি টয়লেটে যান। কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট পরিষ্কার না হওয়ার কারণে তিনি সেখানে মলত্যাগের জন্য বেশ জোরে ‘প্রেসার’ বা বেগ দিয়েছিলেন। আর এই অতিরিক্ত জোর দেওয়াই তাঁর জীবনে ডেকে আনল এক অদ্ভুত অন্ধকার।
বাথরুম থেকে বেরোনোর পরেই তাঁর আচরণ অদ্ভুত ঠেকছিল পরিবারের লোকেদের কাছে। ১০ বছর আগের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া ওই মহিলা নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানদের দেখেও অবাক হয়ে যান। বেগতিক দেখে পরিবার তাঁকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁর মাথার এমআরআই (MRI), সিটি স্ক্যান (CT Scan) সহ সমস্ত নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রিপোর্টে কোনও ব্রেন টিউমার, স্ট্রোক বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের চিহ্ন মেলেনি।
অবশেষে চিকিৎসকরা এক হাড়হিম করা সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাঁরা জানান, বাথরুমে বসে পায়ুদ্বারে অতিরিক্ত মাত্রায় জোর দেওয়ার ফলে (যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Valsalva maneuver বলা হয়) মহিলার মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ সাময়িকভাবে থমকে গিয়েছিল। আর তাতেই ঘটে গেছে এই চরম বিপর্যয়।
ডাক্তাররা এই বিরল ও অদ্ভুত অবস্থার নাম দিয়েছেন ‘ট্রান্সিয়েন্ট গ্লোবাল অ্যামনেশিয়া’ (Transient Global Amnesia বা TGA)। এটি এমন এক সাময়িক কিন্তু তীব্র স্মৃতিভ্রংশের অবস্থা, যা হুট করে মানুষকে তাঁর সাম্প্রতিক অতীত ভুলিয়ে দেয়। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শৈশব বা বহু পুরনো স্মৃতি অক্ষত থাকে, কিন্তু গত কয়েক বছরে তাঁর জীবনে কী কী ঘটেছে— তা মাথা থেকে মুছে যায়।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হল, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নতুন কোনও স্মৃতি তৈরি করতে পারেন না। তাই তিনি কয়েক মিনিট অন্তর অন্তর একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকেন, কারণ আগের মিনিটে তিনি কী উত্তর পেয়েছেন, তা তাঁর মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারে না। সাধারণত এই সমস্যা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, তবে হংকংয়ের এই মহিলার ক্ষেত্রে এর রেশ বেশ কিছুটা দীর্ঘ ছিল।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টয়লেটে মাত্রাতিরিক্ত জোর দেওয়াই নয়, আচমকা ভারী ওজন তোলা, তীব্র মানসিক চাপ বা হঠাৎ রক্তচাপের ওঠানামা এই বিপজ্জনক রোগটিকে ট্রিগার করতে পারে। সাধারণত ৫০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা গেলেও, ব্যতিক্রমীভাবে তরুণদের মধ্যেও এটি ঘটতে পারে। তবে স্বস্তির খবর এটাই যে, এই রোগ স্থায়ী নয়। কিছু সময় পর রোগীরা আবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তাঁদের স্মৃতি ফিরে পান।
হংকংয়ের এই ঘটনাটি যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, তখন নেটিজেনদের একাংশ আতঙ্কে শিউরে ওঠেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, “এখন দেখছি টয়লেটে যাওয়াও বিপজ্জনক!” আবার অনেকে রসিকতা করে লিখেছেন, “কাল থেকে বাথরুমে আর কোনও হিরোগিরি নয়, এবার থেকে বড় বাথরুম করার সময়ে একদম হালকা চাপ দেব!”
মজা যাই হোক না কেন, বাথরুমের মতো অতি সাধারণ এক জায়গায় সামান্য অসাবধানতা যে মানুষের জীবনের আস্ত একটা দশক মুছে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ!















