বিশ্ব যখন একবিংশ শতাব্দীর মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে নারীর ক্ষমতায়ন আর লিঙ্গসাম্যের কথা বলছে, ঠিক তখনই সভ্যতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে আফগানিস্তান। ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই সে দেশে আফগান নারীদের শিক্ষা, চাকরি এবং স্বাধীনতার ওপর একের পর এক ফতোয়া জারি করেছে তালিবান শাসক। এবার তাদের নয়া ফৌজদারি আইন (Penal Code) বিশ্ববাসীকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দিয়েছে। ঘরোয়া হিংসাকে আইনি সিলমোহর দিয়ে তালিবানের নয়া নিদান— ‘স্ত্রীর হাড় না ভাঙলে বা শরীরে গভীর ক্ষত না হলে, স্বামী তাকে মারধর করতেই পারে!’

তালিবানের শীর্ষ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সই করা এই নতুন দণ্ডবিধিতে নারী ও শিশুদের ওপর হিংসাকে কার্যত আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনও করে, কিন্তু সেই মারধরের চোটে যদি নারীর হাড় না ভাঙে, চামড়া কেটে রক্তপাত না হয় কিংবা শরীরে স্থায়ী কোনও দাগ না পড়ে— তবে সেই ‘হালকা মারধর’-এ পুলিশ বা প্রশাসন কোনও হস্তক্ষেপ করবে না। অর্থাৎ, ঘরের চারটে দেওয়ালের মধ্যে নিজের জীবন বাঁচাতে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার পথও আফগান নারীদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

কোনও নারী যদি এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আদালতের দরজায় কড়া নাড়েন, তবে সেখানেও অপেক্ষা করছে চরম হেনস্থা। প্রথমত, স্বামী যে তাকে মেরেছে, তার যাবতীয় প্রমাণ জোগাড় করার পুরো দায়ভার নির্যাতিতা নারীর নিজের। দ্বিতীয়ত, আদালতে যাওয়ার জন্য তাকে আপাদমস্তক বোরখায় ঢেকে আসতে হবে এবং সঙ্গে থাকতে হবে একজন ‘মহরেম’ বা পুরুষ অভিভাবক। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া একা কোনও নারীর আদালতে যাওয়ারও অধিকার নেই। সম্প্রতি সে দেশেরই এক বিচারকের মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়া এক নির্যাতিতাকে ফিরিয়ে দিয়ে সেই বিচারক নাকি গর্ব করে বলেছেন, “একটু-আধটু মারধরে তো কেউ মরে যায় না!”

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন আইনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশের চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতে ২০০৫ সালের ‘গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন’ (Domestic Violence Act) নারীদের সুরক্ষায় এক দুর্ভেদ্য ঢাল। এখানে শারীরিক তো বটেই, সামান্য মানসিক বা আর্থিক নির্যাতন হলেও মহিলারা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষীর কঠোর সাজা নিশ্চিত। অথচ আফগানিস্তানে ২০০৯ সালের ‘নারীদের ওপর হিংসা দূরীকরণ আইন’ (EVAW)-কে সম্পূর্ণ ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে তালিবান সরকার।


তালিবানের এই নয়া মধ্যযুগীয় আইন নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই আইন ঘরোয়া হিংসাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল। ২০২১ সালের পর থেকে আফগান মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ, সিংহভাগ চাকরি থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে এবং পার্ক বা রেস্তরাঁর মতো জনসমক্ষে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এবার এই আইনের পর ঘরের ভেতরের নিরাপত্তাটুকুও হারিয়ে গেল।

তবে এই চরম ভয়ের আবহেও ফুরিয়ে যায়নি প্রতিরোধ। আফগান নারী ও মানবাধিকার কর্মীরা জীবন হাতে নিয়ে গোপনে, ডিজিটাল মাধ্যমে বা ছদ্মবেশে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রেখেছেন। অনেক সক্রিয় কর্মী ইতিমধ্যেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, অনেকেই কাজ করছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তের নারীরা যখন নিজেদের অধিকার বুঝে নিচ্ছেন, তখন আফগান নারীদের এই নীরব কান্না ও যাপন— সভ্য সমাজের বুকে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।