আজকাল ওয়েবডেস্ক: কলকাতা মিষ্টির রাজধানী এই তকমা নিয়ে তর্ক নেই। রসগোল্লা, সন্দেশ, মিষ্টি দই সবকিছুর কেন্দ্রে যেন শহরটাই। কিন্তু বাংলার মিষ্টির খ্যাতির আসল ভিত যে শুধু কলকাতার উপর দাঁড়িয়ে নেই, তার প্রমাণ লুকিয়ে আছে শহরের বাইরের জেলাগুলিতে। বিশেষ করে কলকাতা–দুর্গাপুর হাইওয়ে ধরে যাঁরা একবারও গাড়ি চালিয়েছেন, তাঁদের নাক আর স্মৃতিতে গেঁথে আছে একটি নাম শক্তিগড়।
পূর্ব বর্ধমান জেলার ছোট্ট এই শহর আজ আর শুধু মানচিত্রে চিহ্নিত একটি জায়গা নয়, বরং ল্যাংচার সমার্থক। হাইওয়ের এক বিশেষ অংশে ঢুকলেই দুই ধারে সারি দিয়ে সাজানো মিষ্টির দোকান প্রতিটি দোকানের জানালায়, ট্রেতে, বাক্সে একটাই প্রতিশ্রুতি: ল্যাংচা। বাংলার বাইরে থেকে আসা অনেকের কাছেই এটি ‘লম্বা গুলাব জামুন’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাঙালি জানেন, এই তুলনা ল্যাংচার প্রতি অবিচার।
গুলাব জামুন নরম শক্তিগড়ের ল্যাংচা তার ঠিক উল্টো গাঢ় রং, প্রায় পোড়া মহগনি ছায়া, বাইরের স্তরে শক্ত কামড় আর ভেতরে ঘন, ভারী টেক্সচার। খোয়া যেভাবে ভাজা হয়, সেটাই এই স্বাদের মূল রহস্য। লম্বাটে, প্রায় নলের মতো আকৃতি এটাই ল্যাংচার আলাদা পরিচয়।
প্রথাগতভাবে ল্যাংচা তৈরি হয় খোয়া বা মাওয়া দিয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি করা দুধের ঘন অংশ। এর সঙ্গে ময়দা ও ঘি মেশানো হয়, ভেতরটা নরম রাখতে যোগ করা হয় সামান্য সোডা জল। আকারেও বৈচিত্র্য- কখনও ছোট, বুড়ো আঙুলের সমান, আবার কখনও এমন বড় যে একটিই হাতে ভরে যায়।
যদিও আজ শক্তিগড় মানেই ল্যাংচা, এই মিষ্টির জন্মকথা কিন্তু আরও পুরনো এবং অন্য জায়গার। বাংলা সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল তাঁর রূপমঞ্জরী গ্রন্থে ল্যাংচার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। উনিশ শতকের শেষভাগে নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরেই এই মিষ্টির সূত্রপাত।
কথিত আছে, কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কন্যা গর্ভাবস্থায় বাপের বাড়িতে এসে খাবার ছুঁতে চাইছিলেন না। চিকিৎসা ব্যর্থ হলে তিনি জানালেন, বর্ধমানে খাওয়া এক গাঢ়, সিরায় ভেজা মিষ্টির কথা তাঁর মনে পড়ছে, যদিও নাম মনে নেই। শুধু মনে ছিল, সেই মিষ্টিওয়ালার খুঁড়িয়ে হাঁটার ভঙ্গি। সেই কারিগরকে ডেকে আনা হল, তিনি আবার সেই মিষ্টি বানালেন। রাজকন্যার খিদে ফিরে এল। নাম জিজ্ঞেস করা হলে ‘ল্যাংচা’- অর্থাৎ খোঁড়া- নামটিই থেকে গেল। পরবর্তীতে সেই মিষ্টিকারকে শক্তিগড়ে বসতি দেওয়া হয়, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায়।
হাইওয়ে সংস্কৃতির সঙ্গে শক্তিগড়ের মেলবন্ধনও সময়ের সঙ্গে তৈরি। আগে দোকানগুলি ছিল পুরনো গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে। পরে এনএইচ-১৯ তৈরি হলে যানবাহনের স্রোত বদলায়, আর ব্যবসাও সরে আসে নতুন রাস্তায় আমরাহ গ্রামের অংশে। আজ প্রায় ২৫০ মিটার জুড়ে প্রায় ৩০টি মিষ্টির দোকান। নামগুলিও প্রায় একই ছকে ‘ল্যাংচা ঘর’, ‘ল্যাংচা ভবন’, ‘ল্যাংচা মহল’। মেনুতে সীতাভোগ, মিহিদানাও থাকে, কিন্তু ডাকটা আসে ল্যাংচার দিক থেকেই।
এই দোকানগুলির আরেকটি বড় আকর্ষণ পরিষ্কার শৌচাগার। দীর্ঘ হাইওয়ে সফরে যা প্রায় বিলাস। ফলে বাস, প্রাইভেট কার, দূরপাল্লার যাত্রীরা এখানে থামেন অভ্যাসে, প্রয়োজনে নয়। বাঙালি পরিবারে তো প্রায় অলিখিত নিয়ম বর্ধমান পার হওয়া মানেই গাড়ির মেঝেতে সিরায় ভেজা কার্ডবোর্ডের বাক্স।
শক্তিগড় অবশ্য একা নয়। দেশের নানা প্রান্তে এমন ‘মিষ্টির স্টপেজ’ আছে। ওড়িশার পাহালা চেনা ছেনা পোড়ার জন্য, সড়কের দুই ধারে সারি দিয়ে দোকান। সালেপুরে রসগোল্লার একই দৃশ্য। বাংলায় কৃষ্ণনগর অঞ্চলে সরভাজা, তামিলনাড়ুর পালানি যাওয়ার পথে পঞ্চামৃতম সব ক্ষেত্রেই একটাই প্যাটার্ন: একটি মিষ্টি, একটি রাস্তা, আর যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এক স্বাদ।
গন্তব্য নয়, যাত্রারই অংশ শক্তিগড়ের ল্যাংচা সেই গল্পই বলে। প্রশ্ন শুধু একটাই এই ‘মিষ্টির স্টপেজ’গুলির মধ্যে আপনি প্রথমে কোনটায় থামবেন?
তথ্য সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
