আজকাল ওয়েবডেস্ক: সন্তানের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য কি শুধুই তার নিজের অভ্যাস কিংবা মায়ের গর্ভকালীন যত্নের ফল? সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বাবার জীবনযাপনও সন্তানের শরীর ও মনের ওপর গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। বাবার খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ কিংবা পরিবেশগত বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শ সবই সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রা ও আচরণগত স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

নেমাটোড কৃমি থেকে শুরু করে ইঁদুরের ওপর চালানো নানা গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণকারী পুরুষ ইঁদুরদের সন্তানদের মধ্যে গ্লুকোজ সহনশীলতা কমে যায় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা দেয়, যা পরবর্তী জীবনে ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে, দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকা বাবার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাপ মোকাবিলার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং নানা আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতদিন পর্যন্ত এই প্রভাবগুলি কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছায়, তা ছিল বিজ্ঞানের কাছে এক বড় প্রশ্ন।

বিজ্ঞানী উপাসনা শর্মার নেতৃত্বে সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, বাবার পরিবেশগত অভিজ্ঞতার তথ্য সন্তানের কাছে পৌঁছায় শুক্রাণুর মধ্যে থাকা অতি ক্ষুদ্র নিয়ন্ত্রক অণু যাদের বলা হয় small RNA। এই প্রক্রিয়ায় ডিএনএ-র কোনও  পরিবর্তন হয় না, অথচ সন্তানের বিকাশের গতিপথ বদলে যেতে পারে।

এই গবেষণায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে একটি নির্দিষ্ট RNA খণ্ড, যার নাম tRFValCAC। পুরুষের শরীরে শুক্রাণু যখন পরিপক্ব হয়, তখন এই RNA অত্যন্ত বেশি মাত্রায় শুক্রাণুর মধ্যে জমা হতে থাকে। গবেষকেরা আগেই দেখিয়েছিলেন, কোষ থেকে নির্গত ক্ষুদ্র প্যাকেট বা extracellular vesicle-এর মাধ্যমে এই RNA শুক্রাণুতে পৌঁছায়। নতুন গবেষণায় জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন এই RNA-কে বেছে বেছে ওই প্যাকেটের মধ্যে ঢোকাতে সাহায্য করে যেন সে একটি অতি ক্ষুদ্র স্তরের ‘ম্যানেজার’। যখন এই প্রোটিনের কার্যক্ষমতা কমানো হয়, তখন শুক্রাণুতে পৌঁছানো RNA-এর পরিমাণও নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

নিষেকের সময় এই tRFValCAC শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করে। গবেষকেরা নিষেকের ঠিক পরপরই, যখন ভ্রূণ মাত্র একটি কোষের, তখন এই RNA-এর কার্যকারিতা বন্ধ করে দেন। এর ফলে দেখা যায়, ভ্রূণের জিন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, কোষ বিভাজন ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক ভ্রূণই 'ব্লাস্টোসিস্ট' পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না যা সফল গর্ভধারণের জন্য অত্যন্ত জরুরি ধাপ।

এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশের সময়কার সামান্য ব্যাঘাতও পরবর্তী জীবনে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শর্মার ভাষায়, বাবার পরিবেশগত অভিজ্ঞতার কারণে শুক্রাণুর RNA-তে যে পরিবর্তন আসে, তা ডিএনএ-র কোনও  মিউটেশন ছাড়াই সন্তানের বিকাশকে পুনর্গঠিত করতে পারে এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই গবেষণা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এপিজেনেটিক উত্তরাধিকারের ধারণা যেখানে ডিএনএ-র বাইরেও থাকা তথ্য, যেমন রাসায়নিক পরিবর্তন, প্রোটিন ও ছোট RNA, প্রজন্মের পর প্রজন্মে প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, এই এপিজেনেটিক তথ্য পরিবেশের দ্বারা পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ বাবা কীভাবে বাঁচছেন, কী খাচ্ছেন, কী ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন তার প্রতিফলন সন্তানের শরীরেও পড়তে পারে।

শর্মার মতে, এই প্রক্রিয়াগুলি ভালোভাবে বোঝা গেলে সাধারণ বিপাকজনিত রোগের উত্তরাধিকার সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে সন্তানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা, ভ্রূণের বিকাশ উন্নত করার নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা কিংবা প্রজনন চিকিৎসায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনা সম্ভব হতে পারে। যদিও তিনি নিজেই বলছেন, এই গবেষণা মাত্র শুরু, পুরো ছবিটা বোঝার জন্য আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।