কমলালেবু মানেই শীতের আমেজ, মিঠে রোদে বসে খোসা ছাড়ানোর গন্ধ, আর শৈশবের একরাশ নস্টালজিয়া। বাঙালি আর কমলালেবু যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। কমলা রঙের এই ফল শুধু খেতেই সুস্বাদু নয়, স্বাস্থ্য থেকে সৌন্দর্য কিংবা ঘরের টুকিটাকি নানা কাজে সমানভাবে পারদর্শী। ফলের সঙ্গে  খোসাতেও রয়েছে নানা গুণ। শীতের এই মরশুমি ফলকে কোন কোন উপায়ে ব্যবহার করতে পারেন, জেন নিন- 


ত্বক-চুলের পরিচর্যা 

শীত পড়তেই হাজির হয় ত্বকের হাজার সমস্যা। নামী-দামি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করেও পিছু ছাড়তে চায় না শুষ্কতা। নিষ্প্রাণ ত্বকের যত্ন নিতে খোসা সহ কমলালেবুর জুড়ি মেলা ‌ভার। স্ক্রাব থেকে টোনার কিংবা ফেসপ্যাক, কমলালেবুতে রয়েছে সব সমাধান। 

•    একটা গোটা কমলালেবুর খোসা ১ কাপ জলে সেদ্ধ করে নিন। সেই জল টোনার হিসাবে ব্যবহার করলেই পাবেন ব্রণমুক্ত ত্বক।

•    টাটকা কমলালেবুর খোসার সঙ্গে মুসুরের ডাল বেটে নিন। নিয়মিত এই মিশ্রণ লাগালে ত্বক মসৃণ-নরম তো হবেই, সঙ্গে দূর হবে মুখের যাবতীয় দাগও।

•    দুই টেবিল চামচ কমলালেবুর খোসা গুঁড়ো, কয়েক ফোঁটা লেবুর রস, এক টেবিল চামচ চন্দন গুঁড়ো মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে মুখে লাগান। ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে ঠান্ডা জলে মুখ ধুয়ে নিন। সপ্তাহে অন্তত দু’বার ব্যবহার করলে পুরনো ট্যানও সহজে কমবে।

•    এক টেবিল চামচ কমলালেবুর খোসা গুঁড়ো, এক টেবিল চামচ হলুদ ও এক টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে মুখ, গলায় লাগান। ১০ মিনিট পর গোলাপজল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতেও ত্বকে রোদের পোড়াভাব কাটবে। তবে ব্রণ থাকলে এই প্যাক ব্যবহার না করাই ভাল। 

•    কমলালেবুর খোসা ছাড়িয়ে রোদে শুকনো করে নিন। তারপরে মিক্সিতে গুঁড়ো করে এয়ার টাইট কৌটোয় ভরে রাখুন। সপ্তাহে ২-৩ বার টকদই বা মধুর সঙ্গে এই গুঁড়ো মিশিয়ে মাখতে পারেন। এই প্যাকটি ত্বকে ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে হালকা হাতে স্ক্রাব করে ধুয়ে ফেলুন। এছাড়া কমলালেবুর খোসার গুঁড়োর সঙ্গে চিনি ও নারকেল তেল মিশিয়ে হাত-পায়ে মাখলেও ত্বক উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। 

•    কমলালেবুর রস মাথার ত্বকে লাগালে রক্তসঞ্চালন ভাল হয় এবং চুলের গোড়া মজবুত হয়। খোসার গুঁড়ো চুলে ব্যবহার করলে চুল নরম ও উজ্জ্বল থাকে।

•    তেলের সঙ্গে মিশিয়েও কমলালেবুর খোসা ব্যবহার করতে পারেন। রোদে শুকানো কমলালেবুর খোসা আমন্ড বা জোজোবা অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে নিন। তেলের জারের মধ্যে খোসাগুলো রাখুন। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে যাবে কমলালেবুর খোসার তেল। এই তেল শ্যাম্পু, হেয়ার অয়েল বা ফেসিয়াল অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন।

সাবান তৈরিতে কমলালেবু

•    কমলালেবুর খোসা মিক্সারে ভাল করে বেটে নিন। একটি পাত্রে গ্লিসারিন ঢেলে তার মধ্যে কমলালেবুর খোসা বাটা মেশান। ভাল করে নেড়ে থকথকে মিশ্রণ তৈরি হলে মিশিয়ে দিন এক চা চামচ মধু। এবার গোটা মিশ্রণটি আবারও নেড়ে একটি মোল্ডে রেখে দিন ২৪ ঘণ্টা। তাহলেই জমে সুন্দর সাবান তৈরি হয়ে যাবে। 

•    আমন্ড অয়েল অথবা নারকেল তেল গরম করে নিন। এবার গরম তেল একটি পাত্রে ঢেলে ঠান্ডা করুন। অন্য একটি পাত্রে জলের সঙ্গে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের থকথকে মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। এবার কিছুক্ষণ তেল ও সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের মিশ্রণ মিশিয়ে রাখুন। ওই মিশ্রণে কমলালেবুর পেস্ট দিয়ে মোল্ডে ঢালুন। ২৪ ঘণ্টা পর দেখবেন তৈরি হয়ে গিয়েছে কমলালেবুর সুগন্ধি সাবান।

গৃহস্থালির হরেক কাজে

•    একটি কাচের জারে কমলালেবুর খোসা রেখে তাতে ভিনিগার দিন। ভিনিগার গাঢ় রঙের না হওয়া পর্যন্ত ১-২ সপ্তাহ ভিজিয়ে রাখুন। এরপর মিশ্রণটি ছেঁকে সমপরিমাণ জলের সঙ্গে  মিশিয়ে স্প্রে বোতলে ভরে ব্যবহার করুন। এই স্প্রে রান্নাঘরের সিঙ্ক, টাইলস, জানলা, বাথরুমের কিছু জায়গা পরিষ্কার করতে দারুণ কাজ করে। 

•    ১ লিটার জলে কমলালেবুর খোসা, ২ চামচ নুন, ১ চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে ফুটিয়ে নিন। জল কমলা রঙের হয়ে এলে নামিয়ে ছেঁকে নিন। এরপর এতে একটু ডিশওয়াশার লিকুইড এবং ভিনিগার মিশিয়ে বাসন মাজার ডিটারজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করুন। 

•    কমলার খোসা অর্ধেক করে কেটে তাতে লবঙ্গ গেঁথে দিন। এবার নিচে সলতে বসিয়ে জ্বালালে মিষ্টি সুগন্ধ ছড়াবে।

•    জলে কিছুক্ষণ কমলার খোসা ফুটিয়ে তার সঙ্গে দারচিনি বা লবঙ্গ মিশিয়ে ঘরকে সুগন্ধি করা যায়।

•    খোসা শুকিয়ে গুঁড়ো করে জলের সঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে বোতলে ভরে প্রাকৃতিক সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

•    কমলালেবুর খোসায় প্রচুর নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম থাকে, যা গাছের জন্য চমৎকার জৈব সার হিসেবে কাজ করে।কমলালেবুর খোসা শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিন।এই পাউডার সরাসরি গাছের গোড়ায় বা মাটিতে মিশিয়ে দিলে ধীরে ধীরে মাটির পুষ্টি বাড়বে। এছাড়া একটি পাত্রে বা বোতলে কমলালেবুর খোসা এবং জল মিশিয়ে দিন। পাত্রের মুখ বন্ধ করে ২-৩ দিন রাখুন। এরপর জল ছেঁকে এই জল গাছের গোড়ায় ব্যবহার করতে পারেন।