ঘরের বর্জ্যকে সম্পদে বদলে দিচ্ছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। সম্বলপুরের ‘ওয়েলথ সেন্টার’ মডেল আজ গোটা দেশের কাছে দৃষ্টান্ত৷ ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজে বেরিয়ে পড়েন একদল মহিলা। বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ি নিয়ে শহরের অলিগলি ঘুরে ঘরে ঘরে থামেন।
ভেজা বর্জ্য এক দিকে, শুকনো বর্জ্য অন্য দিকে। পথচলতি বাসিন্দারা নাম ধরে ডাকেন তাঁকে। কয়েক বছর আগেও সুনীতা ছিলেন দিনমজুর; আজ তিনি ‘স্বচ্ছ সাথী’ — এক সম্মানিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, যাঁদের হাত ধরেই ওড়িশার সম্বলপুর শহর আবর্জনার স্তূপে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সেই আবর্জনাই শহরকে করে তুলছে আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ।
সম্বলপুর পুরনিগম প্রতি মাসে কেবল বর্জ্য থেকে আয় করছে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ১৭০ মেট্রিক টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ হয় শহরের ৯টি বিকেন্দ্রিত ‘ওয়েলথ সেন্টার’-এ।
ভেজা জৈব বর্জ্য থেকে তৈরি হয় ‘মো-খাতা’ নামের উন্নত মানের জৈব সার, যা কেনেন স্থানীয় চাষি ও নার্সারিগুলি। শুকনো বর্জ্য — প্লাস্টিক, ধাতু, কাগজ, কাচ আলাদা করে বিক্রি হয় নথিভুক্ত ব্যবসায়ীদের কাছে। নিম্নমানের কিছু প্লাস্টিক যায় সিমেন্ট কারখানায়, বিকল্প জ্বালানি হিসেবে। আয়ের সিংহভাগই আসে শুকনো পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে।
ওড়িশাতে রাজ্যজুড়ে ২,১০০-রও বেশি স্বচ্ছ সাথী ও ৪৮৫ জন স্বচ্ছ সুপারভাইজার এই কাজে যুক্ত। এঁরা শুধু আবর্জনা সংগ্রহ করেন না — ঘরে ঘরে বর্জ্য আলাদা করার সচেতনতাও ছড়িয়ে দেন। আগে যে কাজ ছিল অদৃশ্য, অসংগঠিত ও মজুরিহীন, আজ তা হয়ে উঠেছে নির্দিষ্ট বেতন ও সামাজিক মর্যাদাযুক্ত স্থায়ী জীবিকা।
এই মডেলটির সাফল্যের কারণ বর্জ্য পৃথকীকরণ। জিপিএস-যুক্ত গাড়িতে নির্দিষ্ট রুটে ঘরে ঘরে সংগ্রহ; দূরের একটি বিশাল কেন্দ্রের বদলে ছোট ছোট বিকেন্দ্রিত প্রক্রিয়াকরণ; এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর হাতে পরিচালনা। ২০২৩ সালে যেখানে আয় ছিল মাসে দেড়-দুই লক্ষ, সঠিক পৃথকীকরণেই তা পৌঁছেছে ২০ লক্ষে।
ভারত প্রতি বছর প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ টন পুরবর্জ্য তৈরি করে, যা ২০৩০-এর মধ্যে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা। কলকাতার ধাপার আবর্জনা-পাহাড় তো বাঙালির চেনা দুশ্চিন্তা। বাংলাতেও রয়েছে ‘আনন্দধারা’র মতো শক্তিশালী স্বনির্ভর গোষ্ঠী। সম্বলপুর প্রমাণ করে দিল — বিপুল বাজেট নয়, দরকার শুধু পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা। আবর্জনাকে সম্পদ হিসেবে দেখাই ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন শহরের আসল মন্ত্র।















