রাত দুটো। সঙ্গীর নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভাঙছে বারবার। পাশ ফিরে শুলেও লাভ নেই। এদিকে দিব্যি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন পাশের মানুষটি। সকালে উঠেই খিটখিটে মেজাজ, অকারণ ঝগড়া। 
প্লেনে কিংবা ট্রেনে উঠেছেন দু’জনে। একজন উইন্ডো সিটে বসে আকাশ দেখতে চান, অন্যজনের পা ছড়িয়ে বসতে পছন্দ আইল সিট। শেষমেশ একজনকে মানিয়ে নিতে হয়। সঙ্গে শুরু হয় এক রাশ বিরক্তি, অস্বস্তি।

কখনও খাবার খেয়ে বিছানায় রেখে দেওয়া, আবার কখনও ভিজে তোয়ালে যেখানে-সেখানে রাখা। পার্টনারের দৈনন্দিন এমন কত অভ্যাস একেবারে সহ্য হয় না! আর তাই নিয়ে রোজই চলে মনোমালিন্য।

এই আপাতভাবে ‘ছোট’ সমস্যাগুলো থাকলেও প্রিয় মানুষটির থেকে আলাদা হতে চান না অনেকেই। বরং সম্পর্ককে বাঁচাতে খুঁজে নিচ্ছেন নতুন পথ। সেই পথেই জন্ম নিচ্ছে একের পর এক নতুন ‘রিলেশনশিপ ট্রেন্ড’। ‘স্লিপ ডিভোর্স’, ‘সিট ডিভোর্স’ বা ‘লিভিং অ্যাপার্ট টুগেদার’ সহ রয়েছে আরও কত কেতাবি নাম। শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক, এই ট্রেন্ড কিন্তু বিচ্ছেদ নয়, বরং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সচেতন চেষ্টা।

একসময় মনে করা হত, ভালবাসা মানেই সারাক্ষণ একসঙ্গে থাকা অর্থাৎ একই বিছানায় ঘুম, পাশাপাশি বসা, একই অভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই ধারণা। এখনকার যুগলরা বুঝেছেন, একসঙ্গে থাকার মানে সবকিছু একসঙ্গে করতেই হবে, এমন নয়। বরং ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, মানসিক শান্তি আর নিজের ‘স্পেস’-এর গুরুত্বই সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। নতুন প্রজন্ম যেন স্পষ্ট করেই বলছে, ‘ভালবাসি, কিন্তু নিজের মতো থাকতেও চাই।’ আর এই ভাবনা থেকেই শহুরে জীবনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নানা ট্রেন্ড।

লিভিং অ্যাপার্ট টুগেদারঃ সম্পর্কে থাকলেও একসঙ্গে থাকেন না অনেক দম্পতি। আলাদা বাড়িতে থেকেও আঁচ পড়ে না সম্পর্কে। উদ্দেশ্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। এতেই ছোটখাটো ঝগড়াও এড়িয়ে চলা যায়।

ফিন্যান্সিয়াল ডিভোর্সঃ ইদানিং দম্পতিরা নিজেদের আর্থিক বিষয় আলাদা রাখেন। আলাদা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, খরচ ভাগ করে নেওয়া-এসবের মাধ্যমে সম্পর্কে আর্থিক বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় থাকে। ফলে টাকা-পয়সা নিয়ে অশান্তি অনেকটাই কমে।

মাইক্রো-চিটিংঃ আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় লুকিয়ে চ্যাট করা বা হালকা ফ্লার্টকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হত না। কিন্তু এখন অনেকেই এগুলোকেও বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে দেখছেন। ফলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে মাইক্রো-চিটিং।

স্লিপ ডিভোর্সঃ অনেক দম্পতি এখন আলাদা বিছানা বা আলাদা ঘরে ঘুমোনোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কারণ? সঙ্গীর নাক ডাকা, রাত জাগা কিংবা কারও ক্ষেত্রে হালকা ঘুম, কারও গভীর। সবমিলিয়ে একই বিছানায় শোওয়া মানেই ঘুমের ব্যাঘাত।

সিট ডিভোর্সঃ ভ্রমণ মানেই রোম্যান্স, এই ধারণাও বদলাচ্ছে। বরং বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে 'কমফর্ট'। আর সেখানেই জায়গা করে নিচ্ছে‘সিট ডিভোর্স’। ট্রেন হোক বা ফ্লাইট কিংবা সিনেমা দেখতে গিয়ে একসঙ্গে বসতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা অনেকেই এখন মানছেন না।

কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?  ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি হাসপাতালের অধ্যাপক ডাঃ সুজিত সরখেলের মতে, ‘‘আগে সমাজে মেয়েদের বেশি মানিয়ে নেওয়ার কথা বলা হত। ছেলেরা একেবারে অ্যাডজাস্ট করে না তা নয়, তবে যত অসুবিধাই হোক, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায় মেয়েদের ওপর বেশি চাপিয়ে দেওয়া হত। যার মূল কারণ হল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের আর্থিকভাবে নির্ভরশীল থাকতে হত। কিন্তু এখন বাবা-মায়েরা মেয়েকে বড় করার সময়েই স্বাধীনভাবে বাঁচতে শেখাচ্ছেন। খুব তাড়াতাড়ি পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ে দেওয়ার চল কমেছে। উচ্চশিক্ষা, আর্থিকভাবে স্বাধীন হয়ে ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনচেতা হয়ে উঠছেন মেয়েরা। ফলে অ্যাডজাস্ট করলেও নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে আপোস করতে রাজি থাকছেন না অনেকেই। সম্পর্কের এই ট্রেন্ড মেয়েদের আচরণের পরিবর্তনের প্রতিফলন বলা চলে।’’

দু'জন মানুষ যদি সমানভাবে স্বাধীনচেতা হন, তাহলে একজনই কেন সবসময়ে মানিয়ে নেবে- এই প্রশ্ন থেকেই বর্তমানে বদলাছে সম্পর্কের সমীকরণ। এ প্রসঙ্গে ডাঃ সুজিত সরখেলের মতে, ‘‘আমাদের সমাজ এখন কিছুটা পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে অনুসরণ করছে। বর্তমানে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে মেয়েরা যেভাবে এগিয়ে গিয়েছে, তাতে তাঁরাও একইভাবে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর্থিক-মানসিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় মেয়েরা আর নিরুপায় নয়। নির্ভরশীলতা কমে গিয়েছে, বেড়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। একইসঙ্গে যেখানে পরিবারের তরফে মানিয়ে নেওয়ার চোখরাঙানি ছিল, এখন সম্পর্কের যে কোনও সিদ্ধান্তে পাশে থাকছেন বাবা-মা।’’  

সম্পর্কে এই সব ট্রেন্ড কেমন প্রভাব ফেলতে পারে? ডাঃ সরখেলের কথায়, ‘‘ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে যে কেউ যদি একেবারেই মানিয়ে নিতে না চান, তবে তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোটেও ভাল নয়। তবে সঙ্গী নিজের স্পেস, পছন্দকে গুরুত্ব দিলে তা বোঝা জরুরি। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একে অপরের স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিলে ক্ষতি নেই।’’  

নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া কতটা জরুরি? চিকিৎসকের বক্তব্য, আগে মনে ইচ্ছা থাকলেও মেয়েদের নিজের পছন্দ প্রকাশের উপায় থাকত না। বিয়ের প্রাথমিক মধুচন্দ্রিমা পর্ব কেটে গেলেই গৃহবধূদের মতামতকে তেমন পাত্তা দেওয়া হত না। গৃহিণীদের বাড়ির কাজকে গুরুত্ব দিতেন না স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা। আর্থিক নির্ভরশীলতার কারণে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হত। কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়-এই বেড়াজালে ঘিরে ছিল বেশিরভাগ মহিলার জীবন। এখন সেই চিত্র বদলেছে৷ ভাল থাকার জন্য নিজের স্পেস, পছন্দের কথা বলা অনেক সহজ হয়েছে৷ তাছাড়া কখনও কাউকে স্পেস দিলে সম্পর্কে ছেদ আসে না, বরং গভীরতা আরও বাড়ে।

মাঝে মাঝে একটু দূরত্ব যদি সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়ায় তাতে মন্দ কী!