সন্তানের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট নিজে হাতে সামলে দেওয়াই অভিভাবকের কর্তব্য নয়। বরং তাতেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি, বলছে আধুনিক মনোবিজ্ঞান। 
বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ছোট্ট মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়েছে — বন্ধু আজ তাকে টিফিনের ভাগ দেয়নি। কিংবা ছেলেটি রাগে গজগজ করছে, ভাই কেকের বড় টুকরোটা পেয়ে গেছে বলে। সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার মন ছটফট করে ওঠে, ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি ‘সামলে’ দিতে চান তাঁরা। বাঙালি ঘরে এই দৃশ্য অতি পরিচিত। 

অথচ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মার্কিন মনোচিকিৎসক ও ‘থার্টিন থিংস মেন্টালি স্ট্রং পেরেন্টস ডোন্ট ডু’ গ্রন্থের লেখিকা এমি মরিনের মতে, ঠিক এই অভ্যাসটিই সন্তানের মানসিক দৃঢ়তার সবচেয়ে বড় শত্রু।

মরিনের মতে, সন্তানের প্রতিটি অস্বস্তিকর অনুভূতি — হতাশা, রাগ, কষ্ট, বিরক্তি, অভিভাবক যখন নিজে হাতে দূর করে দিতে চান, তখন শিশু কখনওই শিখতে পারে না কীভাবে এই আবেগগুলির সঙ্গে নিজে লড়াই করতে হয়। বরং তার মনে গেঁথে যায়, কষ্ট পেলে অন্য কেউ এসে তা মুছিয়ে দেবে। 

গবেষণা বলছে, যে শিশুরা ছোট থেকে নিজের আবেগ নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে না, বড় হয়ে তারা উদ্বেগ, অস্থিরতায়, অ্যাংজাইটি ডিপ্রেশনে ভোগে বেশি। 

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সন্তানের কষ্টে পাশে থাকা আর তার হয়ে কাজ করে দেওয়া — দু’টি এক জিনিস নয়। শিশু যখন কাঁদছে, তাকে চুপ করানোর তাড়া না দিয়ে বরং বলুন, “তোমার এখন খুব রাগ হচ্ছে, তাই না?” এতে সে নিজের অনুভূতিকে চিনতে শেখে। তারপর দেখান, কীভাবে সেই অনুভূতি সামলানো যায় — ছবি আঁকা, একটু হেঁটে আসা, কিংবা প্রিয় গান শোনা। ছোট ছোট সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ধাপে ধাপে তার নিজের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে।

যে শিশু ছোট থেকেই নিজের আবেগ চিনতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, বড় হয়ে সে চাপের মুখে শান্ত থাকে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, বন্ধুত্বে স্বচ্ছন্দ হয়। ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস তার ভিতরেই তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘রেজিলিয়েন্স’ — যা আজকের দ্রুতগামী, প্রতিযোগিতামূলক জীবনে যে কোনও ডিগ্রির চেয়ে মূল্যবান সম্পদ।