‘যা চাই পরতে খাইতে পারি,
যেখান খুশি যাইতে পারি…’
ভূতের রাজার বরে এমনটা করতে পারত গুপি-বাঘা। তাই বলে এযুগে সোশ্যাল মিডিয়াতেও তারা যা খুশি তাই করতে পারত কি? সন্দেহ আছে! কারণ, সমাজমাধ্যম ঘিরেও কিন্তু আছে আইনের বেড়াজাল।
আমজনতার একটা বড় অংশের যদিও তাতে থোড়াই কেয়ার! যে যা খুশি লেখেন। যে যা খুশি বলেন। আর জনপ্রিয় যে কেউ, বিশেষত তারকা বা বিশিষ্ট মহলের কারও পান থেকে চুন খসলে ট্রোলের বন্যা বয়, রীতিমতো বসে যায় খাপ পঞ্চায়েত। তা ছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী যে-ই হোন, যখন তখন নানা ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকি তো থাকেই যখনতখন। অথচ এই সব কিছুতেই কিন্তু আছে আইনের সুরক্ষা। সে ট্রোলের শিকার হলেই হোক কিংবা ফেক প্রোফাইল তৈরি হয়ে গিয়ে থাকলে। তারই হালহদিশ দিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী রম্যাণী ঘোষাল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোল
ইদানীং সামান্যতম কারণেও ট্রোলের শিকার হতে হয় অনেককেই। সমালোচনায় শুরু হয়ে তা গড়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, সম্মানহানি, অশালীন ভাষা প্রয়োগ, হুমকি, হেনস্থা কিংবা চরিত্রহননে। যদি কোনও পোস্ট, কমেন্ট বা মেসেজে এমন কিছু ঘটে, সে ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুসারে সম্মানহানি, অপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শন, হেনস্থার দায়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। পাশাপাশি, ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট ২০০০ অনুযায়ী থানা কিংবা সাইবার সেলে অভিযোগ জানিয়ে সেই কনটেন্ট সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরানো যায়। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দাবি এবং আদালতের ইনজাংশনও চাওয়া যেতে পারে। তাই ট্রোলের শিকার হলে অবশ্যই যাবতীয় স্ক্রিনশট, লিঙ্ক এবং ডিজিটাল রেকর্ড সেভ করে রাখতে ভুলবেন না।
অনুমতি ছাড়া ছবি ব্যবহার
অনুমতি ছাড়া নেটমাধ্যমে কারও ছবি ব্যবহার করলে, বিশেষত সে ছবি কোনও ভাবে বিকৃত করা হলে কিংবা অসৎ বা অশালীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে আইনের চোখে তা গুরুতর সাইবার অপরাধ। ভারতীয় আইন ছবির এমন অপব্যবহারের ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়। কেউ এমন ঘটনার শিকার হলে ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট-এর ৬৬ডি ধারা এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুসারে থানায় কিংবা সাইবার ক্রাইম সেলে অভিযোগ জানিয়ে অবিলম্বে সেই ছবি সরানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। আদালতও ইনজাংশন জারি করে সেই বিকৃত ছবি সমাজমাধ্যম বা ইন্টারনেটে ছড়ানো আটকাতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষকে দোষীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নিতে বলতে পারে।
সমাজমাধ্যমে ফেক প্রোফাইল
ইদানীং সমাজমাধ্যমে ফেক প্রোফাইল তৈরি করে নানা ধরনের জালিয়াতির ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। অবশ্যই তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্য কেউ আপনার নাম, পরিচয় বা ছবি ব্যবহার করে ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করেছে নজরে এলে বা জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ক্রাইম সেলের পুলিশকর্মী বা স্থানীয় থানার সাহায্য নিন। সময়মতো যথাযথ প্রমাণ-সহ লিখিত অভিযোগ জানালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
সমাজমাধ্যমে লেখা বা কনটেন্ট চুরি
সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা বা ইন্টারনেট থেকে অন্য কারও লেখা, আঁকা বা তোলা ছবি, নিজস্ব কনটেন্ট কিংবা শিল্পকর্ম চুরি করে তা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কপিরাইট আইনে শাস্তিযোগ্য। কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৫৭ আপনার নিজস্ব কাজকে সুরক্ষা দেয়। উপরোক্ত কোনওভাবে অন্য কেউ তা নিজের বলে দাবি করলে বা আপনার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে এই আইনে গুরুতর শাস্তিবিধান রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও কিছু রয়েছে মানেই তা বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করে ফেলা যাবে, এমনটা নয়।
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া দিন কাটে না প্রায় কারওরই। দিনের বেশির ভাগটা তাই হাতের মোবাইলেই বুঁদ হয়ে থাকেন বেশিরভাগ মানুষ। আর সে কারণেই সমাজমাধ্যমে কী কী করা যায় না বা কীভাবে নিরাপদে থাকতে হবে, দু’দিকটা ঠিকমতো জেনে রাখাটাও ভীষণ রকম জরুরি।
রম্যাণীর মতে, ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রাম, লিঙ্কডইন, এক্স কিংবা রেডিট— যে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মই ব্যবহার করুন না কেন, তাতে অপরাধ এবং শাস্তিবিধানের বিষয়টা বাস্তব দুনিয়ার মতোই। ফলে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে কোনও কিছু পোস্টের আগে তথ্য যাচাই করে নেওয়া, প্রাইভেসি পলিসি বা প্ল্যাটফর্ম পলিসি খতিয়ে দেখা আবশ্যিক। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব কাজ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়, তা হল:
• পোস্টের মাধ্যমে কাউকে অপমান, অশালীন আচরণ, হুমকি, হেনস্থা বা সম্মানহানি, ঘৃণা, অশালীনতা ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত হানা
• কারও সম্পর্কে ভুল বা বিতর্কিত তথ্য ছড়ানো
• কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি প্রকাশ্যে আনা
• কারও অনুমতি ছাড়া তার কপিরাইট আওতাভুক্ত লেখা, তোলা বা আঁকা ছবি, শিল্পকর্ম বা অন্য কোনও কনটেন্ট পোস্ট কিংবা ব্যবহার করা
এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় সুরক্ষিত থাকতে হলে সচেতন থাকার পাশাপাশি নিজেকেও ব্যবস্থা নিতে হবে। রম্যাণীর মতে যা যা করণীয়-
• শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
• টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন অন রাখুন।
• ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় যথেচ্ছ পোস্ট করবেন না।
• নিয়মিত প্রাইভেসি সেটিংস নজরে রাখুন।
• জালিয়াতি থেকে বাঁচতে অজানা লিঙ্ক, অচেনা অ্যাকাউন্ট এড়িয়ে চলুন।
• কোনও রকম সাইবার অপরাধের শিকার হলে দ্রুত প্রমাণ সংগ্রহ করে স্থানীয় থানা বা সাইবার ক্রাইম সেলের সাহায্য নিন।
• অনুমতির বিষয়টা জরুরি। কারও ব্যক্তিগত ছবি, তথ্য, নিজস্ব কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই তাঁর অনুমতি নিন। বেনামে সে সব ব্যবহার করলেও আইনের হাত থেকে নিস্তার নেই কিন্তু।















