আজকাল ওয়েবডেস্ক: আজ স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ব্যবসায়িক কল থেকে ই-মেইল যাচাই, খবর পড়া থেকে বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ—প্রতিদিন অসংখ্য কাজে আমরা ফোন ব্যবহার করি। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই নির্ভরতা আমাদের মস্তিষ্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু-কিশোরদের স্ক্রিন টাইম মহামারীর সময় তিন বছরে ৫২% পর্যন্ত বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ডিজিটাল পর্দায় থাকার ফলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে কী পরিবর্তন আসছে, তা নিয়ে চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে চিন্তা।
মস্তিষ্কের রসায়নে পরিবর্তন
রেডিওলজিক্যাল সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকার এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে আসক্ত, তাদের মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটেছে। গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তনের ফলে স্মার্টফোন ছাড়া অনেকের মধ্যে অস্থিরতা বা উদ্বেগ দেখা দেয়।
চিন্তাভাবনার ক্ষমতায় ঘাটতি
জার্নাল অব দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজিউমার রিসার্চ-এর একটি আলোচিত গবেষণায় পাওয়া গেছে, স্মার্টফোন সামনেই থাকলে—এমনকি বন্ধ থাকলেও—মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়। গবেষকরা এই প্রভাবকে বলেছেন “ব্রেইন ড্রেন হাইপোথিসিস।” কারণ, তথ্য হাতের নাগালে থাকলে মানুষ নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে চিন্তা করার প্রবণতা কম অনুভব করে।
আরেকটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, স্মার্টফোন কাছে থাকলে কর্মস্মৃতি বা working memory–ও কম কার্যকর হয়। বিশেষত যাদের মধ্যে সবসময় কিছু মিস করার ভয় বা 'FOMO' থাকে, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পড়াশোনায় প্রভাব
২০২০ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোনে লেখা পড়লে মানুষ কম বোঝে। গবেষকরা জানান, স্মার্টফোনে পড়ার সময় মানুষ কম নিশ্বাস নেয় এবং মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অতিরিক্ত সক্রিয় হয়, যা বোঝার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ঘুমে ব্যাঘাত
বিজ্ঞানীরা বলছেন, রাতে স্মার্টফোন ব্যবহার করলে নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন কমিয়ে ঘুমে সমস্যা তৈরি করে। এতে মানুষ ঘুমোতে দেরি করে এবং পরের দিন ক্লান্তি, মাথা ভার, উদ্বেগ ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
মানসিক আলস্য
অনেকে আর ফোন নম্বর, ঠিকানা বা তথ্য মনে রাখেন না—সব কিছু স্মার্টফোন নির্ভর। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সাধারণত অন্তর্দৃষ্টি বা দ্রুত অনুমানের ওপর নির্ভর করে চিন্তা করে, তারা স্মার্টফোনের ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং ধীরে ধীরে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার পরিবর্তে অলস চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
সমাধান? সচেতন ব্যবহার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, তবে ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি। ফোন ব্যবহারের সময় ট্র্যাক করা, সীমা নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট সময় ফোন-মুক্ত রাখা এবং ঘুমের আগে ফোন এড়ানো অভ্যাস তৈরি করতে হবে। গবেষণা এখনো প্রাথমিক স্তরে, তবে ক্রমবর্ধমান তথ্য স্পষ্ট করছে—অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার শুধু জীবনযাত্রা নয়, মস্তিষ্কের কার্যক্রমকেও নীরবে পরিবর্তন করে দিচ্ছে।
