ফাল্গুন ও চৈত্র বছরের এমন এক সময়, যখন প্রকৃতিতে বদলের ছোঁয়া স্পষ্ট। সকাল-সন্ধে হালকা ঠান্ডা, আবার দুপুরে চড়া রোদ। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে প্রভাব পড়ে শরীরে। গ্রীষ্মকাল পুরোপুরি আসার আগে বাড়ে বিভিন্ন মরশুমি রোগের প্রকোপ। এই সময়ে কীভবে শরীরের দিকে বাড়তি নজর দেবেন? সেবিষয়ে জানালেন এসএসকেএম হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগীয় প্রধান নীলাদ্রি সরকার।
কেন বাড়ে রোগভোগের প্রকোপ
গরমের শুরুতে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে হয় উর্ধ্বমুখী।কখনও ঠান্ডা, কখনও গরম, এই পরিবর্তনের সঙ্গে শরীর দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারে না। বাতাসে আর্দ্রতার তারতম্য, ধুলোবালির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং শুষ্ক পরিবেশ-সবমিলিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে। সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে জীবাণু।
সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত
গরমের শুরুতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ভাইরাল সংক্রমণ। যেমন সর্দি-কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, হাঁচি
অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট (অ্যাজমা বা সিওপিডি রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি)। এছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নানা ভাইরাসের মতো সংক্রমণও সক্রিয় থাকে। ফলে একজনের থেকে আরেকজনের মধ্যে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
পক্স-হামের দাপট
এই সময় আসার আগে চিকেন পক্সের প্রকোপ বাড়ে। শুরুতে জ্বর, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা এবং তারপর ধীরে ধীরে শরীরে ফোস্কা ওঠে। যে কোনও বয়সেই এই রোগের ঝুঁকি থাকে। চিকেন পক্স সাধারণত নিজে থেকে ঠিক হয়ে যায়। তবে কখনও কখনও রোগীকে ওষুষ ও মলম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। একইসঙ্গে হামও এই সময়ে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। যা ঠিকমতো যত্ন না নিলে পরবর্তীকালে কাশি, নিউমোনিয়া, টিবির মতো গুরুতর রোগের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পেটের সমস্যা ও ডিহাইড্রেশন
তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেকেই বাসি খাবার খেয়ে ফেলেন বা পর্যাপ্ত জল পান করেন না। ফলে পেটের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, বমির সমস্যায় ভোগেন। এছাড়া এই সময়ে গরম পুরোপুরি না পড়লেও ঘামে শরীর থেকে জল বেরিয়ে যায়। ফলে ডিহাইড্রেশনও একটি বড় ঝুঁকি।
মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি
শীত ও গরমের মাঝামাঝি সময়ে মশার উপদ্রব বাড়তে শুরু করে। কোথাও সামান্য জল জমে থাকলেই সেখানে মশার বংশবিস্তার হয়। ফলে ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। ডেঙ্গি বিশেষভাবে বিপজ্জনক, প্রাথমিকভাবে সতর্ক না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কখনও কখনও ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে৷
কারা বেশি ঝুঁকিতে
সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে শিশু ও বয়স্কদের। এছাড়া ডায়াবেটিস, কিডনি, সিওপিডি-র মতো ক্রনিক রোগে আক্রান্ত কিংবা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম তাঁদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
মেনে চলুন
* মশারি টাঙিয়ে শোওয়ার অভ্যাস করুন। বাড়িতে কোথাও জল জমতে দেবেন না। শিশুদের যেন মশা না কামড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
* জ্বর হলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। একইসঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ সম্পূর্ণ করতে হবে৷
* খুব তেষ্টা না পেলেও সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করুন।
* টাটকা খাবার খান, বাসি খাবার এড়িয়ে চলুন।
* বাইরে থেকে এসে এবং খাওয়ার আগে হাত ধোওয়া অভ্যাস করুন।
* সর্দি-কাশি থাকলে মাস্ক ব্যবহার করুন।
* ডায়রিয়া হলে ওআরএস খান।
* শিশুদের সময়মতো টিকা দিন।
* বয়স্কদের নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এবং প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন নিলে ভাল হয়৷
জীবনযাপনে শৃঙ্খলা জরুরি
সময়মতো খাওয়াদাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস, জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম, প্রাণায়াম করার এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই ছোট থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। যা মরশুমি রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমায়।
