ওজন কমানো মানেই শুধু ক্যালোরি কম খাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন খাবার বেছে নেওয়া, যা মেটাবলিজমকে সক্রিয় রাখে এবং শরীরকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। অনেকেরই অজানা, দৈনন্দিন জীবনের কিছু পরিচিত খাবার নীরবে ওজন কমানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অফিসের টুকিটাকি খাবার থেকে শুরু করে রাতের দেরিতে খাওয়া, কী খাচ্ছেন এবং কখন খাচ্ছেন, দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ।
এভিপি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার ও অ্যাসোসিয়েট রিসার্চ সায়েন্টিস্ট ডা. উমা ভি. জানাচ্ছেন, ওজন কমাতে চাইলে কোন সাত ধরনের খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি।
চিনিযুক্ত স্ন্যাকস ও পানীয়
অনেকেই দিন শুরু করেন মিষ্টি পেস্ট্রি বা চিনি মেশানো কফি দিয়ে, এর ক্ষতিকর প্রভাব না বুঝেই। চিনি রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। প্রথমে সাময়িক এনার্জি মিললেও পরে হঠাৎ শক্তি কমে যায়, যার ফলে আবার খিদে ও মিষ্টির লোভ বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস পেটে চর্বি জমতে সাহায্য করে।
বিকল্প কী করবেন:
এক টুকরো ফল বা অল্প কিছু বাদাম খান। মিষ্টি খেতে ইচ্ছা হলে খেজুর, অল্প মধু বা প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি ফল যেমন বেরি বা আম বেছে নিন।
রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট
সাদা পাউরুটি, নুডলস, পাস্তা ও প্যাকেটজাত স্ন্যাকস রিফাইন্ড ময়দা দিয়ে তৈরি। এগুলি খুব দ্রুত হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়। ফলে দ্রুত খিদে পায় এবং ফ্যাট পোড়ার বদলে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে। এই ধরনের খাবারে ফাইবারও কম থাকে।
বিকল্প কী করবেন:
ব্রাউন রাইস, ওটস, কিনোয়া ও হোল হুইট ব্রেডের মতো সম্পূর্ণ শস্য বেছে নিন। এগুলি ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
ভাজা ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার
ভাজা খাবারে অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও ক্যালোরি বেশি থাকে। এগুলি হজমের গতি কমায়, পেট ফোলায় এবং শরীরের ফ্যাট পোড়ানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অনেকেই বুঝতেই পারেন না, এগুলিতে ক্যালোরির পরিমাণ কতটা বেশি।
বিকল্প কী করবেন:
ভাজার বদলে বেক বা রোস্ট করা খাবার খান। রোস্ট করা ছোলা, এয়ার-ফ্রায়েড সবজি বা ঘরে তৈরি ভেজিটেবল চিপস হতে পারে ভাল বিকল্প।
অতিরিক্ত দুগ্ধজাত খাবার
মিল্কশেক, আইসক্রিম বা ক্রিম দিয়ে তৈরি খাবার সুস্বাদু মনে হলেও এগুলি খুবই ক্যালোরি-সমৃদ্ধ এবং সহজেই বেশি খাওয়া হয়ে যায়। এতে হজম প্রক্রিয়া ধীর হয় এবং ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বিকল্প কী করবেন:
অল্প পরিমাণে টক দই, ঘোল বা হালকা গরম দুধ খান। চিনি না মিশিয়ে, স্বাদের জন্য ফল বা সামান্য দারচিনি যোগ করতে পারেন।
প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার
ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, প্রোটিন বার বা ইনস্ট্যান্ট নুডলস দেখতে সুবিধাজনক হলেও এগুলিতে চিনি, নুন, অস্বাস্থ্যকর তেল ও প্রিজারভেটিভের মাত্রা বেশি থাকে।
বিকল্প কী করবেন:
তাজা উপকরণ দিয়ে সহজ খাবার বানান। ওভারনাইট ওটস, সবজি দিয়ে স্টার-ফ্রাই বা লিন প্রোটিন-সহ স্যালাড দ্রুত তৈরি হয় এবং অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।
ঠান্ডা ও মিষ্টি পানীয়
সফট ড্রিঙ্ক, আইসড কফি বা ঠান্ডা পানীয় সাময়িকভাবে সতেজ লাগলেও এগুলি হজম প্রক্রিয়া ধীর করে এবং মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ায়। খাবারের সঙ্গে বরফ ঠান্ডা জল পান করলেও হজমে সমস্যা হতে পারে।
বিকল্প কী করবেন:
স্বাভাবিক তাপমাত্রার বা হালকা গরম জল পান করুন। হার্বাল টি, আদা জল বা উষ্ণ লেবু জল শরীর হাইড্রেট রাখার পাশাপাশি হজম ও মেটাবলিজমে সাহায্য করে।
রাতের দেরিতে খাওয়া ও ভারী ডিনার
রাতে দেরি করে ভারী খাবার খেলে শরীর ফ্যাট পোড়ানোর বদলে চর্বি জমাতে শুরু করে, কারণ সন্ধ্যার পর মেটাবলিজম স্বাভাবিকভাবেই ধীর হয়। ভারী ডিনারের ফলে পরের দিনও ক্লান্তি ভাব থাকে। এমনকি ছোটখাটো নাইট স্ন্যাকসও অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি যোগ করে।
বিকল্প কী করবেন:
ঘুমানোর অন্তত দু’তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন। হালকা খাবার যেমন স্যুপ, স্যালাড, সেদ্ধ সবজি বা খিচুড়ি বেছে নিন। খুব দরকার হলে ফল বা অল্প কিছু বাদাম খেতে পারেন।
এই খাবারগুলি এড়িয়ে চলাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রথম ধাপ। এর সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত জলপান ও যথেষ্ট বিশ্রাম যোগ করলে ফল আরও ভাল হবে। ওজন কমানো একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এখানে ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে এমন অভ্যাস গড়ে তুললেই চরম ডায়েট বা কঠোর নিয়ম ছাড়াই ওজন কমানো সম্ভব।
