দীর্ঘদিন ধরেই নুনকে খাদ্যাভ্যাসের একপ্রকার ‘খলনায়ক’ হিসেবে দেখা হয়। সুস্থ থাকার নানা পরামর্শে প্রায়ই সকলকে এক কথায় নুন কমানোর উপদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবটা এতটা সাদাকালো নয়। নুন বা সোডিয়াম কেবল খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, শরীরের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। স্নায়ুর সঙ্কেত আদানপ্রদান, পেশির কাজকর্ম, শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, সব কিছুতেই নুনের ভূমিকা অপরিহার্য। তা হলে প্রশ্ন ওঠে, শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এই উপাদানটি কেন এতবার অসুস্থতার জন্য দায়ী করা হয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে শরীরের নিজস্ব গঠনে, কোনও চূড়ান্ত নিয়মে নয়।

এই বিতর্কের দিকটি পরিষ্কার করেছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসক ডা. দিমিত্রি ইয়ারানোভ। সম্প্রতি নুন নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে তিনি নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন। ৯ জানুয়ারি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি জানান, নুন সকলের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই কে নুন কমাবেন এবং কেন, তা বোঝা জরুরি, সকলকে এক নিয়মে বাঁধা ঠিক নয়।

ডা. ইয়ারানোভের কথায়, “নুন সকলের জন্য শত্রু নয়। নুন মানবজাতিকে ধ্বংস করেনি, বরং অতিরিক্ত সরলীকৃত স্বাস্থ্য পরামর্শই সমস্যার মূল। সোডিয়াম প্রয়োজনীয়। স্নায়ু, পেশি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনধারণের জন্য।” তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন, ভুল শারীরিক অবস্থায় নুন ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে পারে। কার শরীর কতটা নুন সহ্য করতে পারে, তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারা নুন কমাবেন?

হার্ট ফেলিওর রোগী
হার্ট ফেলিওরে ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নুন শরীরে জল জমিয়ে দেয়। এতে শ্বাসকষ্ট বাড়ে, বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সম্ভাবনাও কমে যায়।

রেজিস্ট্যান্ট হাই ব্লাড প্রেসার
যাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিন বা চারটি ওষুধ লাগে, তাঁদের জন্য নুন বিশেষভাবে ক্ষতিকর। ডা. ইয়ারানোভের মতে, এই ক্ষেত্রে নুন সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়।

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ
দীর্ঘদিনের কিডনি রোগে ভোগা রোগীদের নুন কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ অতিরিক্ত সোডিয়াম কিডনির ক্ষতি দ্রুত বাড়ায় এবং শরীরের জলীয় ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

লিভার সিরোসিস ও পোর্টাল হাইপারটেনশন
লিভার সিরোসিসের কারণে হওয়া পোর্টাল হাইপারটেনশনে অতিরিক্ত নুন পেটে জল জমার সমস্যা বাড়াতে পারে। এতে পেটের ভিতরের চাপও বৃদ্ধি পায়।

বয়স্কদের ধমনীর সমস্যা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধমনীগুলি আগের মতো নমনীয় থাকে না। ফলে অতিরিক্ত নুন সহজে সামলাতে পারে না শরীর। এর ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। ডা. ইয়ারানোভ বলেন, “২৫ বছর বয়সে যে ভাবে শরীর নুন সামলাতে পারত, বয়স বাড়লে তা আর সম্ভব হয় না।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নুন পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে, প্রয়োজন অনুযায়ী নুনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। সুস্থ থাকার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সঠিক মানুষের জন্য সঠিক পরামর্শে।