আজকের দ্রুতগতির জীবনে বাড়তে থাকা কাজের চাপ এবং বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস হজমের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিত জাঙ্ক ও অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া, রাত জাগার অভ্যাস, অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং মানসিক চাপ, এই সব মিলিয়ে গ্যাস, পেট ফোলা, বুকজ্বালা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও খিদে না পাওয়ার মতো সমস্যা এখন তরুণদের মধ্যেও অত্যন্ত সাধারণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল হজমশক্তির প্রভাব শুধু পাকস্থলীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাবার ঠিকমতো হজম না হলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে না। এর ফলে ক্লান্তি, বিরক্তি, ত্বকের সমস্যা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তবে আয়ুর্বেদে রয়েছে এক সহজ ঘরোয়া সমাধান, যা বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তা হল পানপাতা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. অঞ্জু চৌধুরীর মতে, পানপাতা চিবানো হজমতন্ত্রের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে। তিনি জানান, পানপাতা চিবোলে লালারস নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা খাবার ভাঙতে সাহায্য করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে মসৃণ করে তোলে।
আয়ুর্বেদ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, পানপাতায় থাকা প্রাকৃতিক তেল, আঁশ ও সুগন্ধি উপাদান মলত্যাগের প্রক্রিয়া নিয়মিত করতে সাহায্য করে। এটি ‘বাত দোষ’ প্রশমিত করে বলে মনে করা হয়, যা গ্যাস, পেটব্যথা ও অনিয়মিত হজমের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও পানপাতা অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি কমাতে সাহায্য করে, ফলে বুকজ্বালা ও বদহজম থেকে দ্রুত স্বস্তি মেলে। কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা মানুষের ক্ষেত্রেও পানপাতা উপকারী হতে পারে, কারণ এটি অন্ত্রের পেশিকে সক্রিয় করে মলত্যাগ সহজ করে। পাশাপাশি হজম এনজাইম সক্রিয় করে খিদে বাড়াতেও সহায়তা করে বলে মনে করা হয়।
খাবারের পর পান খাওয়ার যে দীর্ঘদিনের প্রথা রয়েছে, তারও একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। পানপাতায় থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিসেপটিক গুণ মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করতে সাহায্য করে। ফলে দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস, মাড়ির সংক্রমণ ও দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা কমার সম্ভাবনা থাকে।
হজমের পাশাপাশি পানপাতা স্নায়ুতন্ত্রের উপরও শান্তিদায়ক প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়। এটি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্ত পরিশোধনে সহায়ক, যার প্রভাব ত্বকের স্বাস্থ্যেও পড়ে। প্রাচীনকালে সর্দি, কাশি ও হাঁপানির মতো শ্বাসযন্ত্রজনিত সমস্যাতেও পানপাতা ব্যবহার করা হতো। এর উষ্ণ প্রকৃতি বুকে জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, পানপাতার উপকারিতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে এটি কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে তার উপর। ডা. চৌধুরীর পরামর্শ, পানপাতা খেতে হলে মৌরি বা এলাচের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গেই তা ব্যবহার করা উচিত। তাঁর কথায়, “তামাক, চুন বা রাসায়নিক উপাদান যোগ করলে উপকার তো নষ্ট হয়ই, বরং গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।” তাই পানপাতাকে অভ্যাস নয়, বরং একটি ভেষজ ওষুধ হিসাবেই গ্রহণ করা উচিত।
পান শুধু নেশা নয়! ঠিক মতো খেলে ওষুধের খরচ শেষ, কী কী উপকার জানুন
