গোপাল সাহা

রাজ্যে নতুন করে চোখ রাঙানো শুরু করেছে রোটা ভাইরাস। শিশুদের ভ্যাকসিনের পরেও এই সংক্রমণ যথেষ্ট চিন্তায় শহর কলকাতার চিকিৎসকরা সহ স্বাস্থ্য দপ্তর।

কারণ শহর কলকাতা মেডিকেল কলেজে শিশু বিভাগের চিকিৎসকদের একটা চিন্তার দানা বেঁধেছে। বিগত কয়েকদিন ধরে সদ্যোজাত শিশু থেকে বছর  ২-৩ এর শিশুদের মধ্যে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিচ্ছে যা রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়। 

কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মিহির সরকার ও চিকিৎসক দিব্যেন্দু চৌধুরী বলেন, 'বিগত বেশ কিছুদিন ধরে সদ্যোজাত শিশুরা তার পরিবারের সঙ্গে আসছেন চিকিৎসা করানোর জন্য। মূলত তাদের বয়স  অনূর্ধ্ব তিন বা চার বছর। যাদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, জ্বর, বমি, সর্দি কাশি, খেতে না চাওয়া, এই সকল লক্ষণ।'

রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের কারণে এ ধরনের উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়। তবে অধিকাংশই আউটডোরে চিকিৎসা করিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছু সংখ্যক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে সেই সংখ্যাটা খুবই অল্প। 

যদিও কলকাতা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের চিকিৎসকদের দাবি এখনো পর্যন্ত তেমন কোন রিপোর্ট পাওয়া যায়নি যার জন্য বলা যেতে পারে রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের কথা।

আর রোটা ভাইরাস নিয়ে রাজ্য সরকার যথেষ্ট সচেতন। রাজ্য তথা দেশে (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন সিডিউল) জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি নির্দেশিকা অনুযায়ী রাজ্য সরকার টিকার ব্যবস্থা রেখেছে।

প্রতিনিয়ত সদ্যোজাত শিশুদের প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন দিয়ে চলেছে। তাই এ বিষয়ে আতঙ্ক বা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সচেতন থাকা এবং ওআরএস নিয়মিত খাওয়ানোই একমাত্র পথ। যাতে খুব শীঘ্রই এই সংক্রমনের উপসর্গগুলি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

তবে এই মুহূর্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শহর কলকাতায় বাইপাস সংলগ্ন এক বেসরকারি হাসপাতালে রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত ২ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। ভর্তি করার সময় তাদের তীব্র ডায়রিয়া, বমি, জ্বর ও পেটব্যথার লক্ষণ ছিল।

পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা পড়ে। বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আক্রান্ত দুই শিশুর একজনের বয়স ১১ মাস এবং অন্যজনের ৪ বছর; তারা গড়িয়া ও সোনারপুর এলাকার বাসিন্দা।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, আরও অনেক শিশু একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। গুরুতর না হলে তাদের ভর্তি না করে ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হচ্ছে।

তবে চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোটা ভাইরাস ডায়রিয়া নিয়ে এখনই কোন ভয়ের কিছু বিষয় নেই। আর শীতের সময় বা শীত যাওয়ার সময় শিশুদের এই ভাইরাসে আক্রান্তের বা সংক্রমনের হার প্রত্যেক বছরই লক্ষ করা যায়। আর এই ভাইরাসের সংক্রমন লক্ষ করা যায় মূলত সদ্যোজাত শিশু থেকে তিন বছরের মধ্যে শিশুদের।

কলকাতা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কোন বিষয় নেই। সচেতন থাকতে হবে এবং শিশুদের ঘন ঘন ওআরএস খাওয়াতে হবে। মা ও বাবাদের শিশুদের প্রতি অবশ্যই নজর রাখতে হবে। কোনভাবে যাতে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় কিংবা বাথরুম করানোর সময় হাত পরিষ্কার থাকে।’

এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রাজ্য সরকারের প্রতিনিয়ত রোটা ভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নিয়মিতভাবে (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন সিডিউল) জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি নির্দেশিকা অনুযায়ী সদ্যোজাত শিশুদের দেওয়ার পরেও রোটা ভাইরাসে সংক্রমণ যথেষ্ট পরিমাণে লক্ষ করা যাচ্ছে। 

শহর কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর আক্রান্তের বিষয় নিয়ে যথেষ্টই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযুক্তা দে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযুক্তা দে বলেন, "এই ভাইরাসের প্রকোপ মূলত এক বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। আর এই ভাইরাসের আক্রান্তের কারণে কিডনি পর্যন্ত ফেলিওর হয়ে মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণে বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগেই। সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা দেশের সরকার এই ভাইরাস নিয়ে প্রতিষেধক বা টিকাকরণ কাজ নিয়মিত করে যাচ্ছে (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন সিডিউল) জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি নির্দেশিকা অনুযায়ী। তারপরেও কিভাবে এই সংক্রমণ তা যথেষ্টই চিন্তার বিষয়। এই প্রতিষেধক টিকাকরণের নিয়ম হচ্ছে, শিশুর জন্মানোর ছয় মাস থেকে ৮ মাস বয়সের মধ্যে তার তিনটি টিকা বা প্রতিষেধক সম্পূর্ণ করতে হয়।"

এখানে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি শিশুদের প্রতিষেধক বা টিকাকরণ ঠিকমতো হচ্ছে না কিংবা গাফিলতি হচ্ছে নাকি অন্য কিছু?"  সেই নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক সংযুক্তা দে সহ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোটা ভাইরাসের টিকাকরণ সঠিক সময় হলে শরীরে অ্যান্টি বডি তৈরি হয়। যার ফলে এই রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা গড়ে ওঠে।

পাশাপাশি যে সমস্ত শিশুদের ঠিকমতো টিকাকরণ হয়, তারা পরবর্তীতে আক্রান্ত হলেও শরীরের এই অ্যান্টিবডি প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ফলে ভয়ের মাত্রা কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পোলিওর মতো করে ঘরে ঘরে যদি এই রোটা ভাইরাল ডায়রিয়া টিকাকরণ করানো যায়, তাহলে এর প্রকোপ একেবারেই কমে যাবে। আর তার জন্য সরকারের নজরদারি ও সহযোগিতা অবশ্যই জরুরি।

এই রোগের প্রতিরোধ একমাত্র ভ্যাকসিন বা টিকাকরণ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অন্যথায় শিশুদের প্রাণ পর্যন্ত যেতে পারে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। এমনটাই জানিয়েছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা।

যদিও পূর্বের তুলনায় বর্তমানে এই ভাইরাসে আক্রান্তের কারণে মৃত্যুর হার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে টিকাকরণের পরেও শিশুদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্তের হার কি করে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নিয়েও যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকসমাজ।