আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলা-বিরোধী কেন্দ্রীয় সরকারের এসআইআর-এর মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যার প্রতিবাদে ও বাংলার বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণের চক্রান্তের বিরুদ্ধে ধর্না অবস্থানের আজ দ্বিতীয় দিন। শনিবার সকালে ধর্মতলায় ধর্নামঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সামনেই বক্তব্য পেশ করলেন প্রতীক উর রহমান।
এদিন ধর্নার দ্বিতীয় দিনে প্রতীক উরের কণ্ঠেও বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কটাক্ষের সুর। মমতা ব্যানার্জির সামনেই 'জয় বাংলা' স্লোগান তোলেন তিনি।
প্রতীক উর বলেন, 'প্রথমেই আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাদের নেত্রী, বাংলার জননেত্রী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে। এখন এই মঞ্চে নেই অভিষেক ব্যানার্জি, কিন্তু তাঁর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ, তাঁর হাত ধরে আমি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছি। আমি অভিভূত, আমি আনন্দিত, এই এত বড় মঞ্চে আমাকে বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।'
এরপরই প্রতীক উর বলেন, 'সংবিধানের যখন প্রথম পাতা খুলে আমরা দেখি, তখন বড় বড় করে স্পষ্ট করে লেখা থাকে, উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া। এখন দুর্ভাগ্যের হলেও সত্য, এই বিজেপি আসার পরে আর এই ভ্যানিশ কুমার না জ্ঞানেশ কুমার আসার পরেই জিজ্ঞেস করেন, হু দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া। নির্বাচনের আগে উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া, নির্বাচনের পর হু দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া।'
নির্বাচন কমিশনকে কটাক্ষ করে বলেন, 'এই জ্ঞানেশ কুমারের প্রচুর জ্ঞান। শুধু কাণ্ডজ্ঞানটুকু নেই। মানুষের জন্য কাজ করার জন্য যে নির্বাচন কমিশন, মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা, সেটুকু কাজ তিনি করেন না। যেনতেন প্রকারেন বিজেপির দালালি করতে হবে, মানুষের হয়রানি করতে হবে, বিজেপির স্লোগানকে বাংলার মাটিতে বাস্তবায়িত করতে হবে। তার জন্য যত নাম আছে, সব কেটে বাদ দাও।'
প্রতীক উরের আরও দাবি, 'বিজেপির নেতারা দিল্লিতে গিয়ে হন্যে হয়ে পড়ে আছেন। পশ্চিমবঙ্গে জিততে পারছে না। টাকা দিয়েছে, গাড়ি দিয়েছে, বডি গার্ড দিয়েছে। তারপরেও কেন তোমরা জিততে পারছো না। বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রচুর রোহিঙ্গা এসেছে, তাই আমরা জিততে পারছি না। সেই জন্য নির্বাচন কমিশনকে বাংলায় পাঠানো হল। যাঁরা তৃণমূলকে সমর্থন করেন, তাঁরা আদিবাসী, এসসি, এসটি হতে পারেন, তাঁরা মুসলমান হতে পারেন, তাঁদের নাম রাতারাতি কেটে বাদ দাও। ওই জন্য আমাদের নেত্রী নাম দিয়েছেন, ভ্যানিশ কুমার।'
তাঁর আরও বক্তব্য, 'তৃণমূলকে ভ্যানিশ করতে পারবে না। কিন্তু ছাব্বিশের পরে, আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলে যাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এই বাংলার মানুষ পদ্মফুলকে ভ্যানিশ করবে। তার জন্য বাংলার মানুষ তৈরি হচ্ছে। কী অদ্ভুত অবস্থা, স্লোগান তোলা হচ্ছে, হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান, মুসলিম যাও পাকিস্তান। আর সেই স্লোগানকে স্ট্যাম্প মারছে নির্বাচন কমিশন।'
এরপরই তাঁর বক্তব্যে উঠেছে ভারতের বৈচিত্র্যের কথা। তৃণমূলের নতুন নেতা বলেন, 'আমাদের পশ্চিমবঙ্গে আসুন। এখান থেকে হাওড়াতে গিয়ে ট্রেনে উঠুন। যে হকার আপনার সঙ্গে বাংলায় কথা বলবেন, তাঁর উপাস্য দেবতা মা দুর্গা, মা কালী। সেই ট্রেন চলে যাবে ওড়িশায়। সেখানকার হকারের উপাস্য দেবতা জগন্নাথ দেব। যে ট্রেন তামিলনাড়ুতে যাবে, সেখানকার হকারদের উপাস্য দেবতা মীনাক্ষী। তার কিছুক্ষণ পর ট্রেন চলে যাবে অন্ধ্রপ্রদেশ, হকারের উপাস্য দেবতা হবে নিশিম্বা। সেখান থেকে কেরল, উপাস্য দেবতা হবে পরশুরাম। এটাই আমার ভারতবর্ষ। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান। সেই ভারতবর্ষের ঐতিহ্যকে প্রতিদিন আরএসএস, বিজেপি, নির্বাচন কমিশন মিলে ভাঙতে চাইছে। তোমার নাম কী? প্রতীক উর রহমান! তাহলে তুমি বাংলাদেশি। তাহলে তুমি রোহিঙ্গা। তাহলে তোমার কাগজ দেখাও। এবার কান খুলে শুনে রাখুন, নেত্রী আছেন বলেই বলার সাহস পাচ্ছি, তোমাদের কাগজ দেখাব না।'
দল বদলের পরেও বামেদের স্লোগানের সুর প্রতীক উরের কন্ঠে শোনা গেল। একদা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ব্রিগেডের সমাবেশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'এই লড়াই আমাদের লড়তে হবে।' এদিন মমতা ব্যানার্জির ধর্নামঞ্চেও প্রতীক উর বলেন, 'তাই আমাদের সামনে কঠিন লড়াই। এই লড়াই আমাদের লড়তে হবে। এই লড়াই লড়বার জন্য এই রাজ্যের মাটিতে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই লড়াইয়ের জন্য বাংলার জননেত্রী প্রতিদিন আশ্বস্ত করছেন।' ছোটবেলার একটা বিজ্ঞাপনের তুলনা টেনে তিনি আরও বলেন, 'পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দিদি একটা ব্র্যান্ড। যাঁকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।'
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষেই আমতলায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি-র হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলে যোগ দেন প্রতীক উর রহমান। দলবদলের পরপরই সিপিএম তাঁকে বহিষ্কার করে। এরপর থেকেই রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি।
দলীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আগেই সিপিএমের প্রাথমিক সদস্যপদ-সহ জেলা ও রাজ্য কমিটির দায়িত্ব ছাড়ার চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রতীক উর। তখনই জল্পনা শুরু হয়েছিল তাঁর তৃণমূলে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে। ছাব্বিশের ভোটের আগে এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক মহলে ‘কৌশলগত চাল’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
