আজকাল ওয়েবডেস্ক: সংসদীয় রাজনীতির অঙ্কে আসন সংখ্যা শূন্য হতে পারে, কিন্তু মানুষের মনে যে আদর্শের ভিত কতটা গভীরে থাকতে পারে, তা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন কলকাতার এক অ্যাপ ক্যাব চালক। পেশার তাগিদে রোজগারের ক্ষতি স্বীকার করেও নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাসকে বিসর্জন দেননি তিনি। গাড়িতে লাগানো শ্রমিক সংগঠনের স্টিকার খোলা নিয়ে এক যাত্রীর সঙ্গে তাঁর বাদানুবাদ এবং অনড় অবস্থানের একটি ভিডিও এখন নেটপাড়ায় রীতিমতো ভাইরাল। নেটিজেনদের বড় অংশই ওই চালকের সততা ও মেরুদণ্ডকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার নিউটাউন সংলগ্ন এলাকা থেকে। অন্যান্য দিনের মতোই একটি বুকিং পেয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছান ওই অ্যাপ ক্যাব চালক। তিনি বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিআইটিইউ-র (CITU) একজন সক্রিয় সদস্য এবং ভালোবেসে নিজের গাড়িতে সংগঠনের ‘কাস্তে-হাতুড়ি’ খচিত প্রতীক লাগিয়ে রেখেছিলেন। যাত্রী গাড়িতে ওঠার পরই বিষয়টি তাঁর চোখে পড়ে এবং তিনি চালককে নির্দেশ দেন ওই স্টিকারটি অবিলম্বে খুলে ফেলতে। যাত্রীর যুক্তি ছিল, কোনও বাণিজ্যিক গাড়িতে রাজনৈতিক প্রতীক থাকা উচিত নয়।
এখানেই বেঁকে বসেন চালক। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে যাত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এটি তাঁর কাছে স্রেফ কোনও দলীয় রাজনীতি নয়, বরং তাঁর রুটি-রুজি এবং লড়াইয়ের আদর্শ। তিনি জানান, এই সংগঠন তাঁকে ও তাঁর মতো অসংখ্য চালককে রাস্তায় নিরাপত্তা দেয়, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ায়। তাই নিজের ভালোবাসার প্রতীক তিনি কোনওভাবেই গাড়ি থেকে সরাবেন না।
পরিস্থিতি জটিল হয় যখন যাত্রী সাফ জানিয়ে দেন যে স্টিকার না তুললে তিনি এই গাড়িতে যাবেন না এবং সংস্থার কাছে চালকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানাবেন। বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে দিনে একটা বুকিং বাতিল হওয়া মানে যে কোনও ক্যাব চালকের পক্ষেই বড় আর্থিক ক্ষতি। কিন্তু সেই লোকসানকে পরোয়া না করে চালক নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। তিনি যাত্রীকে সসম্মানে গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার অনুমতি দেন, কিন্তু আদর্শের প্রতীক হাতছাড়া করেননি।
পরবর্তীতে ওই ক্ষুব্ধ যাত্রী চালকের গাড়ির ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। পাল্টা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা ক্যামেরার সামনে ভাগ করে নেন চালকও। গর্বের সুরে তিনি বলেন, গত দু-বছর ধরে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর থেকে তিনি রাস্তায় নিজেকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করেন এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস পান। তাই কোনও যাত্রীর ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে তিনি নিজের আত্মপরিচয় মুছে ফেলতে রাজি নন।
নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে বামেদের নিয়ে যতই কটাক্ষ বা সমালোচনা চলুক না কেন, এই ঘটনা প্রমাণ করল যে বামপন্থা আসলে একটা মনন, যা ভোটের ফলের চেয়েও অনেক বড়। ক্ষণিকের আর্থিক লাভের চেয়ে নিজের আত্মসম্মান ও আদর্শকে এগিয়ে রাখা এই অ্যাপ ক্যাব চালক সমাজের বুকে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।















