আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সাক্ষর হয়েছে। ডরাচ্ছে আমেরিকা। সীমান্তের অপারেও থরহরিকম্প! প্রমাদ গুনছে পাকিস্তান। পড়শি দেশ থেকে বহু পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। বিশেষ করে বস্ত্র এবং পোশাক। এই দুই শিল্পের আয় অনেকটাই নির্ভরশীল ইউরোপের বাজারের উপর। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে এবার পাকিস্তানের রাপ্তানিতে থাবা বসানোর অপেক্ষায় ভারত। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের 'তুঘলকি ' শুল্ক নীতির জেরে ভারতের শ্রম-নিবিড় খাতগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির ফলে এবার সেই লোকসান অনেকটাই মেটানো সম্ভব বলেও মনে করছে নয়াদিল্লি।
আতঙ্কিত শাহবাজ শরিফ সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশ পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ফলে সেই দেশের বার্ষিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৮.২৫ লক্ষ কোটি টাকা) ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়বে পাকিস্তানের বস্ত্র এবং পোশাক শিল্প।
শুক্রবার পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে যে, ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে পাক রপ্তানির উপর যে কোনও প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য ইসলামাবাদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তাছাড়া, পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য তাড়াতাড়ি আয়োজিত আন্তঃমন্ত্রক বৈঠকও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তানে নিযুক্ত ইইউ-র রাষ্ট্রদূতের মধ্যে বৈঠকের পর এটা অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, "আমরা ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে এবং ব্রাসেলসে ইইউ সদর দপ্তরের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।"
পাকিস্তান কেন প্রমাদ গুনছে?
ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্যের সময়সীমা পাকিস্তানের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। কারণ এই চুক্তির ফলে ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। ভেঙে পড়তে পারে সেদেশের অর্থনীতি। বিশ্বব্যাঙ্কের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তানের রপ্তানি অংশ ১৯৯০-এর দশকে জিডিপির ১৬ শতাংশ থেকে অনেকটা কমে ২০২৪ সালে প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে।
ভারত-ইইউ চুক্তি ইউরোপীয় বাজারে পাকিস্তানের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে। পাকিস্তান ইইউ-তে জেনারেলাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্সেস প্লাস (GSP+) মর্যাদা ভোগ করে। এর জেরে পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা তাদের রপ্তানির প্রায় ৬৬ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশের উপর ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়।
২০১৪ সালে প্রদত্ত GSP+ মর্যাদার অধীনে, পাকিস্তান ইউরোপে তার টেক্সটাইল রপ্তানি ১০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ২৭ সদস্যের ইইউ জোট প্রতি বছর পাকিস্তানের টেক্সটাইল রপ্তানির প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪০ শতাংশ অবদান রাখে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পাকিস্তানের জন্য GSP+ মর্যাদা আগামী বছর শেষ হবে।
টেক্সটাইল খাত হল, পাকিস্তানের বৃহত্তম শিল্প এবং এর রপ্তানি আয়ের বৃহত্তম উৎস। এই খাতটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থান হয়।
বাণিজ্য চুক্তিটি কীভাবে ভারতের জন্য উপকারী হবে?
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আগে ভারতের বস্ত্র ও পোশাক পণ্যের ওপর ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপিত ছিল। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে, ইইউ এখন সাত বছরের মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করা ৯৯ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করবে। ভারতও তার পক্ষ থেকে ইইউ থেকে আসা ৯৭ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করবে।
এটা ভারতকে শ্রম-নিবিড় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বিশাল প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে, যা ট্রাম্পের শুল্কের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পোশাক, রত্ন, গয়না এবং জুতো। ফলস্বরূপ, পাকিস্তান এতদিন ধরে যে অবাধ রপ্তানি সুবিধা ভোগ করত, তা হারাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যারা বর্তমানে ইউরোপে শুল্কমুক্তভাবে পোশাক রপ্তানি করে। তাদের পোশাক রপ্তানি এখন আরও কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে।
গত ২৭শে জানুয়ারি ভারত-ইইউ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর সংবাদিক বৈঠকে,কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ভারতের লাভের এই দিকটি তুলে ধরেছিলেন। গোয়েল বলেছিলেন, "এত বছর ধরে প্রশ্ন ছিল যে, বাংলাদেশ কীভাবে ইইউতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, আর ভারত তা পারে না? এর কারণ ছিল, বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হওয়ায় 'শূন্য শুল্ক' সুবিধা পেত।"
পাকিস্তানের ওপর প্রভাব:
ইইউ-এর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে পরিস্থিতি এখন মৌলিকভাবে বদলেছে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ভারতীয় বস্ত্র ও পোশাকের ওপর শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে।
অল পাকিস্তান টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (এপিটিএমএ) প্রধান কামরান আরশাদ 'দ্য ডন'কে বলেন, "ইইউ বাজারে ভারত উল্লেখযোগ্যভাবে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে, যা কার্যকরভাবে পাকিস্তানের জিএসপি+ সুবিধাকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এটাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।"
তাছাড়া, ইইউ জিএসপি+ মর্যাদা বাড়াবে কিনা, সে বিষয়েও কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ এই জোট একটি অস্থিতিশীল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আগ্রাসী চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
শরিফ সরকারকে বাস্তবতার মুখোমুখি করিয়ে পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ড. গোহার এজাজ বলেন, ইইউ বাজারের সঙ্গে ইসলামাবাদের "শূন্য-শুল্কের মধুচন্দ্রিমা" শেষ হয়ে গিয়েছে। ড. এজাজ জোর দিয়ে বলেন যে, ১০ মিলিয়ন চাকরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি টুইট করেছেন, "পাকিস্তানকে অবশ্যই শিল্পকে আঞ্চলিক জ্বালানি, কর এবং অর্থায়নের খরচে এই অঞ্চলে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দিতে হবে। শিল্প আর কাঠামোগত অদক্ষতার বোঝা বহন করতে পারবে না।"
'দ্য ডন'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানি রপ্তানিকারকরা সতর্ক করেছেন যে- সরকার যদি উৎপাদন খরচ, বিশেষ করে জ্বালানির শুল্ক না কমায়, তাহলে ইউরোপের বাজারে দেশটির অংশীদারিত্ব কমে যেতে পারে এবং বস্ত্র খাতে কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে।
শরিফ সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। শনিবার পাকিস্তান উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য শিল্প গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের শুল্ক ৪.০৪ পাক টাকা কমানোর ঘোষণা করেছে।
ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'সবচেয়ে বড় চুক্তিটি' রপ্তানি খাতে পাকিস্তানের জন্য নিঃসন্দেহে 'সবচেয়ে বড় ধাক্কা' হিসেবে এসেছে।
