ইরানের 'সৌন্দর্যের প্রতীক' এই রাজকন্যার প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আত্মহত্যা করেন ১৩ জন
নিজস্ব সংবাদদাতা
৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬ : ৩০
শেয়ার করুন
1
9
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটি ছবি কখনও কখনও ইতিহাসের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ঠিক তেমনই এক চরিত্র হয়ে উঠেছেন তথাকথিত ‘প্রিন্সেস কাজর’। গোঁফওয়ালা এক পারসিক রাজকন্যার ছবি ঘিরে দাবি—তিনি ছিলেন উনিশ শতকের পারস্যে (বর্তমান ইরান) সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ আদর্শ, যাঁর প্রেম প্রত্যাখ্যান করার পর আত্মহত্যা করেছিলেন ১৩ জন পুরুষ। হাজার হাজার লাইক, শেয়ার আর মিমে ভরে গেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স।
2
9
কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই গল্পের বড় অংশটাই কল্পনা। গবেষকদের মতে, ‘প্রিন্সেস কাজর’ নামে কোনো একক রাজকন্যার অস্তিত্বই ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ানো ছবিগুলি আসলে দু’জন আলাদা পারসিক রাজকন্যার—ফাতেমেহ খানুম, যিনি পরিচিত ছিলেন এসমত আল-দৌলেহ নামে, এবং তাঁর সৎ বোন জাহরা খানুম, যাঁকে ইতিহাস চেনে তাজ আল-সালতানেহ নামে। দু’জনেই ছিলেন কাজর রাজবংশের শাসক নাসের আল-দিন শাহ কাজরের কন্যা।
3
9
নাসের আল-দিন শাহ ছিলেন ফটোগ্রাফির প্রতি প্রবল অনুরাগী। উনিশ শতকের পারস্যে যখন ফটোগ্রাফি ছিল বিরল ও অভিজাতদের সম্পত্তি, তখন তিনি নিজেই ক্যামেরা হাতে হারেমের নারী, পরিবার-পরিজন এমনকি নিজের পোষা বিড়ালেরও ছবি তুলতেন। সেই কারণেই কাজর রাজপরিবারের মহিলাদের এত বিপুল আলোকচিত্র আজও টিকে আছে। পরবর্তীকালে এই ছবিগুলিই প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ‘প্রিন্সেস কাজর’ নামে।
4
9
ভাইরাল গল্পের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ—১৩ জন প্রেমিকের আত্মহত্যা—ঐতিহাসিকভাবে টেকে না। দু’জন রাজকন্যাই খুব অল্প বয়সে বিবাহিত হন এবং রাজপরিবারের কঠোর পর্দা-প্রথার মধ্যে বড় হন। বিবাহের আগে বহিরাগত পুরুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগই ছিল না। ফলে প্রেমিক প্রত্যাখ্যানের গল্প আসলে আধুনিক কল্পনার ফল।
5
9
বাস্তবে, এই দুই নারীর জীবন ছিল অনেক বেশি জটিল ও অর্থপূর্ণ। এসমত আল-দৌলেহ মাত্র ১১ বছর বয়সে বিবাহিত হলেও তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক ও শিক্ষিত। ফরাসি শিক্ষিকার কাছে পিয়ানো ও সূচিশিল্প শিখেছিলেন, ইউরোপীয় কূটনীতিকদের স্ত্রীদের আতিথ্য করতেন এবং রাজসভায় এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
6
9
অন্যদিকে তাজ আল-সালতানেহ ছিলেন সময়ের বহু আগেই জন্মানো এক বিদ্রোহী কণ্ঠ। ১০ বছর বয়সে বিয়ে হলেও তিনি পরবর্তীকালে দুইবার বিবাহবিচ্ছেদ করেন, নারীমুক্তি ও জাতীয়তাবাদী চিন্তায় যুক্ত হন এবং নিজের আত্মজীবনী Crowning Anguish-এ পারস্যের নারীদের দমবন্ধ করা জীবনের নির্মম বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি লিখেছিলেন, পারস্যের নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্যই করা হয় না—তাদের গবাদিপশুর সঙ্গে এক কাতারে রাখা হয়। স্বাধীনতা ও অগ্রগতির প্রশ্নে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন।
7
9
ভাইরাল পোস্টগুলিতে যেটুকু সত্য আছে, তা হল সৌন্দর্যবোধের প্রশ্ন। উনিশ শতকের পারস্যে নারীদের ঘন ভুরু ও উপরের ঠোঁটের লোম সৌন্দর্যের অংশ হিসেবেই দেখা হত। হার্ভার্ডের ইতিহাসবিদ আফসানেহ নাজমাবাদি দেখিয়েছেন, সে সময় নারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে গোঁফ আঁকতেন, আবার দাড়িহীন, কোমল মুখাবয়বের পুরুষদেরও আকর্ষণীয় মনে করা হত। ইউরোপীয় আধুনিকতার প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সৌন্দর্য ধারণা বদলে যায়।
8
9
ফলে ‘প্রিন্সেস কাজর’ মিম পুরোপুরি মিথ না হলেও ভয়ংকর রকম সরলীকৃত। এটি ইতিহাসকে নাটকীয় করে তোলে, কিন্তু মানুষের চিন্তা, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অবস্থানকে আড়াল করে দেয়। বাস্তবে এসমত আল-দৌলেহ ও তাজ আল-সালতানেহ ছিলেন কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নন—তাঁরা ছিলেন রাজনীতি, সংস্কৃতি ও নারীর আত্মপরিচয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
9
9
সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে এই পার্থক্য বোঝা কঠিন। কিন্তু একটু থেমে তাকালে স্পষ্ট হয়—ভাইরাল মিমের আড়ালে থাকা সত্য প্রায়শই আরও গভীর, আরও অস্বস্তিকর এবং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।