উদ্দালক

 

যেন সাধারণ মানুষের কোনও কাজ নেই। অফিস কাছারি নেই, আত্মীয় পরিবার নেই, ডাক্তার দেখানো, অস্ত্রোপচার, কিছুই নেই। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে যাওয়া এক দেশে তাঁদের একটাই কাজ, নিজেকে দেশপ্রেমিক প্রমাণ করা। প্রমাণ করা সে আসলেই এই দেশের মানুষ। এতবছর পর সহজ-স্বাভাবিক ভারতবাসীকে ফের এক লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। হ্যাঁ, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে কার্যত এথনিক ক্লেনজিং অর্থাৎ জনজাতি শুদ্ধিকরণের প্রাথমিক এক ধাপ পার করতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু সেই কারণে যে হয়রানির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, তার হিসাব কে রাখবে! কে মেটাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব। ভোটের মুখে তাই রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ কার্যত ঘুরে গিয়ে হয়েছে একমুখী। 

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আজীবন অ্যাগ্রেসিভ অর্থাৎ আগ্রাসী রাজনীতি করে এসেছেন। দাঁতে-দাঁত চেপে পড়ে থাকা, বারবার আটকে দেওয়া ঘটনাস্থলে আইন ভেঙে ঢুকে পড়া, পুলিশের হাতে মার খেয়েও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে না যাওয়ার রেকর্ড তাঁর আছে। কিন্তু সাধারণত বিরোধী রাজনীতিক থেকে ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশের পর সাধারণত নেতানেত্রীদের আন্দোলনে কিছুটা ভাঁটা পড়ে। কিন্তু আই-প্যাকের অফিসে যেদিন আচমকা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা হাজির হয়েছিল, সেদিন যেভাবে তৃণমূলের সুপ্রিমো হিসাবে মমতা সেখানে হাজির হলেন, কার্যত আগলে রাখলেন দলকে, উদাহরণ তৈরি করলেন, সেটা অনেকের পক্ষেই আন্দাজ করা সম্ভব হয়নি। সেদিন মমতা যে আগ্রাসী এবং নাছোড়বান্দা রূপ দেখিয়েছিলেন, তা পুরনো মমতাকে মনে পড়ায়। মনে পড়ায় সিঙ্গুরে অনশনে টানা বসে থাকা মমতাকে, বা বাইকে করে সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর চোখরাঙানির উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে শহিদ পরিবারের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো মমতাকে। আর সেই চিত্রই হয়রানির উল্টোদিকে আয়না ধরেছে। যেখানে মানুষ অসহায়, সেখানে কার্যত নিজের অবস্থান, দল ও রাজনীতি নিয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী মমতা যে তাঁকে কোনওকিছু দিয়েই আটকানো যাচ্ছে না।

 

 

শুধু মমতা নন, দোসর অভিষেকও। তিনি তাঁর সভায় এসআইআর-এর কারণে বাদ পড়া লোকেদের হাজির করছেন। জেলায়-জেলায় সাধারণ মানুষের সামনে কার্যত চ্যালেঞ্জ করে চলেছেন কমিশনকে, এবং বর্তমান বিরোধী দল বিজেপিকে। সব মিলিয়ে এ কথা বলা চলে, বিজেপির নীল নকশায় যা ছিল, বাস্তবে তা মোটেই ঘটছে না। এসআইআর করে তৃণমূলকে ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিল বিজেপি, তবে ঘটনা হয়েছে উল্টো। তৃণমূলকে আগের থেকেও বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে, ভোটের ময়দানে মমতা-অভিষেক জুটিকে দেখাচ্ছে ধারাল ছুরির মতো। 

কেন এমন হল! কারণ, গড়পড়তা সাধারণ মানুষ খেপে গিয়েছে এই পরিস্থিতিতে। শ্যামবাবুকে অফিস থেকে অতিরিক্ত ছুটি নিতে হয়েছে। রামবাবুকে সারাবাড়ি তোলপাড় করে কাগজপত্র খুঁজতে হয়েছে। যদুবাবুকে পরিবারের এমন সব লোকেদের কাছে যেতে হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ। এমনই নানারকম ঘটনা মানুষকে বিরক্ত করেছে। আসলে বাঙালি কী চায়! মোটের উপর চাহিদা খুব বেশি কিছু নয়। যা চলছে চলুক, এই নীতিতেই বেশিরভাগ বাঙালির আস্থা। সকালে একই সময়ে বাজারে যাওয়া, একই সময়ের ট্রেন ধরে নির্দিষ্ট সময়ে অফিস পৌঁছানো। ফিরে এসে নির্দিষ্ট সময়ে গরম চা নিয়ে বসে পরিবার, বন্ধু বা পাড়ার ক্লাবে কিছুটা সময় কাটানো। ছুটিতে পুরী, দীঘা, দার্জিলিং বা বেড়াতে যাওয়া বা একটু আলাদারকম রান্নাবান্না করে আয়েস করে মধ্যাহ্নভোজন সারা। এই স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে গেলেই সে বিরক্ত হয়। প্রাথমিক ভাবে সেটা বিরক্তি থাকে, কিন্তু ক্রমে সেটা পরিণত হয় রাগে, কারণ, তখন সে খুঁজে পায় তাঁর বিরক্তির বাস্তবিক কারণ। এসআইআর-এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে পুঞ্জিভূত হয়েছে প্রবল রাগ। সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ রাস্তাঘাটে দেখাও যাচ্ছে। কোথাও পূর্বপুরুষের কবরের মাটি নিয়ে শুনানিতে যাচ্ছেন কেউ, কেউ অস্ত্রোপচার বাতিল করে যাচ্ছেন শুনানিতে, এবং কেউ আবার ট্রাঙ্ক নিয়ে যাচ্ছেন, কোথাও আবার বিয়ের সাজে বরযাত্রী সমেত বর পৌঁছে যাচ্ছেন শুনানিতে। এটা তো সাধারণ নয়, এমন তরঙ্গ বাঙালি জীবনকে অত্যন্ত বেকায়দায় ফেলেছে, আর তাতেই বিরক্তি ক্রমে রাগে পরিণত হয়েছে। 

 

নির্বাচনের মুখে এই পূঞ্জিভূত রাগ ও মমতা ব্যানার্জির আগ্রাসী রাজনীতির দু-মুখো আক্রমণের মুখে পড়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছে বিজেপি। কারওর কারওর মতে, জনজাতি শুদ্ধিকরণের প্রাথমিক ধাপ পার করতে গিয়েই দিল্লির সেট করা টার্গেট কোনওভাবেই পূর্ণ করতে পারেনি কমিশন, সেই কারণেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেনসির নামে ঝামেলায় ফেলা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আবার বিজেপি বলছে, না, সকলের জন্যই যে এক নিয়ম, কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীকে যে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি, সকলের ডাক পাওয়াতেই তা প্রমাণিত হয়। কিন্তু ভোটের রাজনীতি তো ততটা সহজ পথে এগোয় না বা গড়ায় না। বরং সেখানে 'গণ'-এর ভূমিকায় সবচেয়ে বেশি। মোটের উপর পশ্চিমবঙ্গের এই 'গণ' ভয়ানক রেগে গিয়েছে। আর সেই রাগের প্রতিরূপ দেখা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আর অভিষেক ব্যানার্জির শক্ত চোয়ালে। ফলে নিজেদের দিকে হাওয়া ঘোরাতে গিয়ে উল্টে তৃণমূলের পালে হাওয়ার জোর বাড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি। আগামী নির্বাচনের ফলে শুধু এই এক ইস্যুতেই গেরুয়া শিবিরের মুখ পোড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।