আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের চেনাব নদীর ওপর দুলহস্তি-২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। এর পরেই পাকিস্তানের তীব্র প্রতিবাদ দেখাতে শুরু করেছে। ভারত তার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করার পর গত মাসে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক এই সিদ্ধান্তটি অনুমোদন করে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি ডিসেম্বরে তাদের ৪৫তম বৈঠকে এই প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের কিশতওয়ার জেলায় ৩,২০০ কোটি টাকারও বেশি আনুমানিক ব্যয়ের এই রান-অফ-দ্য-রিভার প্রকল্পের জন্য নির্মাণ কাজের দরপত্র আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারতের পরিকল্পনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান। নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন ও অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ এনেছে প্রতিবেশী দেশ। পাকিস্তানি সেনেটর এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেত্রী শেরি রহমান ভারতের এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান সমালোচক। তিনি বলেছেন, “জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাটা কোনও ভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয় এবং এটি গ্রহণযোগ্যও নয়।”
দুলহস্তি স্টেজ-২ বর্তমান ৩৯০ মেগাওয়াট দুলহস্তি স্টেজ-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের (দুলহস্তি পাওয়ার স্টেশন) সম্প্রসারণ। ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন লিমিটেড ২০০৭ সালে এটি চালু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩,৬৮৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৮.৫ মিটার ব্যাসের একটি পৃথক সুড়ঙ্গের মাধ্যমে জল প্রবাহিত করে দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য একটি অশ্বখুরাকৃতির জলাধার তৈরি করা হবে।
এই প্রকল্পে একটি সার্জ শ্যাফট, একটি প্রেসার শ্যাফট এবং দু’টি ১৩০ মেগাওয়াট ইউনিটের একটি ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা রয়েছে। যার ফলে মোট ক্ষমতা ২৬০ মেগাওয়াট এবং বার্ষিক ঠিক এত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্পটির জন্য মোট ৬০.৩ হেক্টর জমির প্রয়োজন হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য কিশতোয়ার জেলার বেঞ্জওয়ার এবং পালমার গ্রামের ৮.২৭ হেক্টর জমির প্রয়োজন হবে।
পরিবেশ মন্ত্রকের অধীনে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি (ইএসি) মূল্যায়নে স্বীকার করেছে যে, চেনাব অববাহিকার জল ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি কাঠামোর অধীনে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ করে ব্যবহার করে এবং উল্লেখ করেছে যে প্রকল্পটির নকশা চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। তবে, কমিটি স্পষ্টভাবে এও উল্লেখ করেছে যে, ‘সিন্ধু জলচুক্তি ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে কার্যকরভাবে স্থগিত করা হয়েছে’।
পাকিস্তান কেন প্রতিবাদ করছে?
সিন্ধু জলচুক্তি অনুযায়ী, পাকিস্তান সিন্ধু, ঝিলাম এবং চেনাব নদীর জলের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখত। অন্যদিকে ভারত রাভি, বিতস্তা এবং সুতলজ নদীর উপর অধিকার বজায় রেখেছিল। তবে, চুক্তিটি স্থগিত হওয়ার পর থেকে ভারত পদ্ধতিগত বাধ্যবাধকতা যেমন, পাকিস্তানকে আগে থেকে অবহিত করা বা নদীর প্রবাহ এবং নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত তথ্য নিয়মিত ভাগ করে নেওয়ার মতো বিষয়গুলি মানতে বাধ্য নয়।
২২ এপ্রিলের বর্বর পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর চুক্তিটি স্থগিত করার পরে কেন্দ্র বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সাওয়ালকোট, রাতলে, বুরসার, পাকাল দুল, কোয়ার, কিরু এবং কীরথাই-১ ও ২-এর মতো বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি রয়েছে।
পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির হুসেন আন্দ্রাবি বলেছেন, “আমরা চেনাব নদীর উপর দুলহস্তি স্টেজ-২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ভারতীয় পরিকল্পনা সম্পর্কিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলি দেখেছি। স্বাভাবিকভাবেই, এই প্রতিবেদনগুলি গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই প্রকল্প সম্পর্কে পাকিস্তানকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।”
তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার’ অভিযোগও তুলেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির জন্য নিযুক্ত পাকিস্তানি কমিশনার প্রকল্পগুলোর প্রকৃতি, পরিধি ও প্রযুক্তিগত বিবরণ সম্পর্কে ভারতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ভারত পশ্চিমি নদীগুলির উপর একতরফাভাবে কোনও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য তার ‘সীমিত সুযোগের’ অপব্যবহার করতে পারে না।
