আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর প্রতিষ্ঠা সনদে ভিয়েতনামের সই শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেই নয়, ভারতীয় বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও কর্মী মহলেও প্রবল আলোড়ন তুলেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে, এই ঘটনাকে ঘিরে আবেগ, মোহভঙ্গ, দ্বিধা এবং তাত্ত্বিক পুনর্মূল্যায়নের এক জটিল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অনেক ভারতীয় বামপন্থীর কাছে ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরেই ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতার এক প্রতীক। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এবং পার্টি-নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারাবাহিকতা- এই সবকিছু মিলিয়ে ভিয়েতনাম এক ধরনের রাজনৈতিক ‘নৈতিক আশ্রয়’ হিসেবেই কল্পিত ছিল।
সেই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক শান্তি বোর্ডে ভিয়েতনামের যোগদান অনেকের কাছে এসেছে এক গভীর মানসিক ধাক্কা হিসেবে।
“ভিয়েতনাম আমার দেশ”- একটি প্রজন্মের মোহভঙ্গ
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এক বামপন্থী কর্মী লিখেছেন, "ছোটবেলা থেকে সমাজতন্ত্রকে ঘিরে যে রোমান্টিক স্বপ্ন তিনি বহন করে এসেছেন, তার শেষ আশ্রয় ছিল ভিয়েতনাম। তাঁর ভাষায়, “শ্রমজীবী, বাঙালি, পূববঙ্গের শিকড়, নারী- এর সঙ্গে ভিয়েতনাম ছিল আমার পরিচয়ের অংশ।”
এই পোস্টে তিনি সমাজতন্ত্রকে ‘রোমান্টিসিজম’ হিসেবে দেখার প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করেন এবং বলেন, সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ আদতে নিখাদ ‘কেজো’ রাজনীতি যেখানে খিদে, রোজগার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। তাঁর মতে, ভিয়েতনামের এই সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘদিনের মোহভঙ্গের প্রক্রিয়াকেই সম্পূর্ণ করল, এক ধরনের ‘ক্লোজার’ এনে দিল।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ভিয়েতনামের সিদ্ধান্ত কোনও আকস্মিক বিচ্যুতি নয়, বরং এক বাস্তববাদী রাষ্ট্রনৈতিক অবস্থান, যেখানে আদর্শের চেয়ে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য ও কূটনৈতিক কার্যকারিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পাল্টা মত: ধৈর্য, চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স
তবে এই আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে, সামাজিক মাধ্যমেই উঠে এসেছে সংযত ও সতর্ক কণ্ঠস্বর। একাধিক বাম সমর্থক মনে করছেন, এত দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো রাজনৈতিকভাবে অপরিণত।
একজন লিখেছেন, রাজনীতিতে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ভিয়েতনামের অবস্থান, কিংবা এখনও পর্যন্ত সিপিআই(এম)-এর কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অনুপস্থিতি- এই সব দিক বিবেচনা না করে ভিয়েতনামকে আদর্শগতভাবে বাতিল করে দেওয়া ঠিক হবে না।
তাঁদের মতে, বাম রাজনীতিতে ধৈর্য একটি মৌলিক গুণ, তা মতাদর্শগত প্রশ্নেই হোক বা সাংগঠনিক স্তরেই হোক। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, ভিয়েতনাম কি সমাজতান্ত্রিক কাঠামো থেকে আদর্শগতভাবে বিচ্যুত হচ্ছে, নাকি আন্তর্জাতিক শক্তিসমীকরণে নিজের কৌশলগত অবস্থান নতুন করে সাজাচ্ছে।
সমাজতন্ত্রের বদলে যাওয়া সংজ্ঞা?
এই বিতর্কের মধ্যেই উঠে আসছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন, একবিংশ শতকে সমাজতন্ত্রের অর্থ কি বদলাচ্ছে? কিছু বাম চিন্তক মনে করছেন, এশিয়া ও তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে পুঁজিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব এখন মূলত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট শক্তির হাতে, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি অনেক ক্ষেত্রেই সমালোচনামূলক দূরত্ব বজায় রেখে ‘পূর্ণ আস্থা’ দেওয়ার পথে হাঁটছে না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভিয়েতনামের সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে একটি বৃহত্তর রূপান্তরের অংশ হিসেবে যেখানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি নিজেদের টিকে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থানের পথ বেছে নিচ্ছে।
আবেগ, রাজনীতি ও বাস্তবতার টানাপোড়েন
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’-এ ভিয়েতনামের সই ভারতীয় বামপন্থী মহলে কেবল একটি কূটনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি এক প্রজন্মের রাজনৈতিক আবেগ, আদর্শগত বিশ্বাস এবং বাস্তব রাজনৈতিক বোধের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্ত।
এই বিতর্ক হয়তো আপাতত সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু এর অভিঘাত গভীর। প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনামকে নিয়ে নয় প্রশ্নটা সমাজতন্ত্রকে আমরা আজ কোন চোখে দেখছি, এবং আদর্শ ও রাষ্ট্রক্ষমতার বাস্তব সমীকরণকে কীভাবে বুঝতে চাইছি, সেই নিয়েই।
