আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেস্তে গিয়েছে মধ্য এশিয়ার 'শান্তি' আলোচনা। এরপরই উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতে নয়া মোড়। হরমুজ প্রণালী খুলতে নারাজ তেহরান। পাল্টা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড, ইরানের বন্দরে প্রবেশ ও বেরনোর পথর আটকানোর ঘোষণা করেছে। সোমবার সকাল ১০টা থেকে যা কার্যকর হবে। নাছোড় ইরানও। মার্কিন কমান্ডের সতর্কবার্তাকে উপহাস করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি হোয়াইট হাউসকে মার্কিন মুলুকে বাড়তে থাকা জ্বালানির (গ্যাসোলিন) দামের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি হোয়াইট হাউসের খুব কাছের অঞ্চলের বর্তমান পেট্রলের দামের একটি ছবি শেয়ার করে মার্কিনিদের সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, খুব দ্রুত তারা এই দামের জন্য 'নস্টালজিয়ায় ভুগবেন' বা এই দামকে মিস করবেন। অর্থাৎ, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ যে ফের সঙ্কটে পড়তে চলেছে সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন মহম্মদ বাঘের গালিবাফ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ করা একটি পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, "পাম্পে তেলের বর্তমান দামগুলো উপভোগ করে নিন। তথাকথিত এই 'অবরোধের' কারণে, খুব শীঘ্রই আপনারা ৪-৫ ডলার দরের জ্বালানির জন্য নস্টালজিয়ায় ভুগবেন।"
ওই এক্স পোস্টে গালিবাফ একটি সমীকরণও শেয়ার করেছেন: "ΔO_BSOH>0 ⇒ f(f(O))>f(O)"। এর সঙ্গে তিনি গুগল ম্যাপের একটি স্ক্রিনশট জুড়ে দিয়েছেন, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম দেখা যাচ্ছে। যা মার্কিন ভোক্তাদের ভবিষ্যতের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে সতর্কবার্তা।
'এক্স' ব্যবহারকারীদের মতে, এই সমীকরণটি ইঙ্গিত দেয় যে- যদি হরমুজ অবরোধের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় (ΔO_BSOH>0), তবে তেলের দামে কেবল সাধারণ 'এক, দুই হারে বাড়বে না, বরং তা চক্রবৃদ্ধি হারে বা অ-রৈখিক পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে (f(f(O))>f(O))।
গালিবাফের পোস্টের সূত্র ধরে 'এক্স'-এর একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'এর সারকথা হল- সরবরাহ কমবে→ দাম বাড়বে → চাপও বাড়বে। প্রথম ধাক্কাটি দাম বাড়ানোর। সেই ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায় দাম আবারও বেড়ে যাবে। তাই সস্তা জ্বালানি যতদিন পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন তা উপভোগ করে নিন।'
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির আলোচনা কোনও চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। এরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী খুব দ্রুতই হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ বা সেখান থেকে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ কার্যকর করা শুরু করবে।
সেইমত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ঘোষণা করেছে যে, তারা সোমবার সকাল ১০টা (ইডিটি বা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময়, যা ইরানি সময় বিকেল সাড়ে ৫টা) থেকে ইরানের সমস্ত বন্দরে অবরোধ কার্যকর শুরু করবে।
সেন্টকম জানিয়েছে, এই অবরোধ "ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে (যার মধ্যে আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত ইরানের সমস্ত বন্দর অন্তর্ভুক্ত) প্রবেশ বা সেখান থেকে প্রস্থানকারী যেকোনও দেশের জাহাজের ওপর নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করা হবে।" তবে তারা এও জানিয়েছে যে, যেসব জাহাজ ইরান-বহির্ভূত বিভিন্ন বন্দরের মধ্যে চলাচল করছে, সেগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে।"
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম
সোমবার মার্কিন তেলের বেঞ্চমার্ক ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর নেপথ্যে ছিল ট্রাম্পের ইরানীয় বন্দরগুলো অবরোধ করার নির্দেশ। লেনদেন শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই, মে মাসের সরবরাহের জন্য 'ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট' (ডাব্লুটিআই)-এর প্রতি ব্যারেলের দাম প্রায় আট শতাংশ বেড়ে ১০৪.৫০ ডলারে পৌঁছয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক 'ব্রেন্ট'-এর জুন মাসের সরবরাহের দাম সাত শতাংশ বেড়ে ১০২ ডলারে দাঁড়ায়।
এশিয় অঞ্চলে দিনের শুরুর দিকের লেনদেনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক 'কসপি' দুই শতাংশ পড়ে গিয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। অন্যদিকে জাপানের 'নিক্কেই' সূচক ০.৩ শতাংশ নিচে নেমে যায়।
গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যাপকভাবে পড়ে গিয়েছিল এবং শেয়ারবাজারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল। এর কারণ ছিল, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের সম্মতি প্রদান। অবশ্য এই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে দ্রুতই সংশয় দেখা দেয়, কারণ ইজরায়েল- লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখে এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধই রয়ে যায়।
ইসলামাবাদে আলোচনা
ইসলামাবাদে একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিয়ে যে আলোচনা চলছিল (যার নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার) তা ব্যর্থ হয়। আলোচনার পর উভয় পক্ষই হতাশা প্রকাশ করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ মন্তব্য করেছেন যে, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা ছিল "নিবিড়, অত্যন্ত গুরুত্বর্পূণ এবং চ্যালেঞ্জিং।" তিনি আরও বলেন যে, ইরানের প্রতিনিধি দল "ইরানের সদিচ্ছা প্রদর্শনের লক্ষ্যে বেশ কিছু জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, যার ফলে আলোচনায় কিছুটা এগিয়েছিল।" তবে আলোচনা কতদূর এগিয়েছিল কিংবা ইরানের সেই 'জোরালো উদ্যোগগুলো' আসলে কী ছিল- সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ইরানের সঙ্গে এই আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মূল লক্ষ্য ছিল,মার্কিন 'রেড লাইন' বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখাগুলো চিহ্নিত করা এবং আলোচনার সুযোগ ঠিক কতটুকু রয়েছে, তা স্পষ্ট করে তোলা। কিন্তু ইরানের প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সেই সব 'রেড লাইন'-এর সবকটিতেই একমত হতে পারেননি।















