আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী সচল করার যে চেষ্টা আন্তর্জাতিক স্তরে চলছিল, তা আচমকাই আরও জটিল রূপ নিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যাতে কোনওভাবেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেই বিষয়ে তিনি তেহরানের কাছ থেকে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা পেয়েছেন। কিন্তু এই স্বস্তির খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, ট্রাম্প চুক্তি চূড়ান্ত করার বদলে আরও কঠিন কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে নতুন একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ইরানের কাছে। আর মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন মোচড় বা ‘টুইস্টে’র কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি আরও পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমেরিকার ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এবং ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-এর মতো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শনিবার ট্রাম্প ইরানকে বিবেচনার জন্য যে নতুন খসড়া পাঠিয়েছেন, তাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি কড়া শর্ত চাপানো হয়েছে। তবে সেই শর্তগুলো ঠিক কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফক্স নিউজ-এ নিজের পুত্রবধূ লারা ট্রাম্পকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট বলেন, "আমার একমাত্র শর্ত হল ইরানের কাছে কোনও পরমাণু অস্ত্র থাকবে না। ওরা এই শর্তে রাজি হয়েছে, যা বেশ আকর্ষণীয়।" তবে ট্রাম্পের এই দাবিকে ইরান কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন রয়েছে। ইরান এর আগেও ট্রাম্পের এমন একাধিক দাবি উড়িয়ে দিয়েছে।
আসলে, আলোচনার টেবিলে বসার আগেই দুই পক্ষের দাবি ও প্রত্যাশার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মূল বিষয়ে কোনও সারগর্ভ আলোচনা শুরু করার আগে আমেরিকাকে তাদের ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করে রাখা ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল আগে ছেড়ে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প এর আগে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করার যে কথা বলেছিলেন, তাকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরানের সংবাদমাধ্যম। এর পাশাপাশি, ইরান দাবি তুলেছে যে এই যুদ্ধ থামানোর চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এদিকে, যেখানে কিছুদিন আগেও মার্কিন কর্তারা দাবি করছিলেন যে চুক্তি প্রায় হাতের মুঠোয়, সেখানে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের গলায় এখন উল্টো সুর। কিছুটা ঢিলেঢালা অথচ প্রচ্ছন্ন হুমকির সুরে তিনি বলেন, "আমার কোনও তাড়া নেই। আমরা ধীরে সুস্থে এগোচ্ছি এবং আমার মনে হয় আমরা যা চাইছি তা পেয়ে যাব। আর যদি তা না পাই, তবে আমরা অন্য পথ ধরব।" পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথও এশিয়ায় এক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের সুরেই সুর মিলিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে আমেরিকা আবারও পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করতে ‘একশো শতাংশ সক্ষম’।
গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তান-এর মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক বৈঠকের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলায় বড় ধরণের হামলা বন্ধ ছিল। কিন্তু তার মধ্যেও চোরাগোপ্তা সংঘর্ষ থামেনি। সম্প্রতি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস দাবি করেছে, তারা তাদের জলসীমায় ঢুকতে যাওয়া একটি মার্কিন সামরিক ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে, যদিও আমেরিকা তা স্বীকার করেনি। এমনকি চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ইরানের বন্দর আব্বাস-এ মার্কিন সেনা ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় মাপের সংঘাত তৈরি হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা রুখতে হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে দুই দেশের অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের ওপর প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে।
অন্যদিকে, লেবানন পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তাঁদের সেনা লেবাননের ভেতরে প্রায় ৩০ কিলোমিটার গভীরে ঢুকে পড়েছে। ইজরায়েলি ফৌজ ইতিমধ্যেই দক্ষিণ লেবাননের আরও বেশ কিছু গ্রাম খালি করার নির্দেশ জারি করেছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ‘পোড়ামাটি নীতি’ (scorched-earth policy) এবং সাধারণ মানুষের ওপর যৌথ শাস্তির দেওয়াল তোলার অভিযোগ এনে অবিলম্বে প্রকৃত যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছেন।
ইজরায়েল সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে তারা লিটানি নদী পার হয়ে ঐতিহাসিক ‘বউফোর্ট দুর্গ’ এবং ওয়াদি আল-সালুকি অঞ্চলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে। গত ১৭ এপ্রিল ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে কাগজে-কলমে একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও বাস্তবে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ এনে অনবরত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মার্চ মাসে মার্কিন-ইজরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ রকেট হামলা চালালে ইজরায়েল লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে। এই আবহে আগামী সপ্তাহে ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চতুর্থ দফার সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও, ট্রাম্পের নতুন শর্ত এবং জমিতে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করল।















