আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-শান্তি চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’ হয়ে গিয়েছে বলে ঘোষণা করার ঠিক একদিন পরেই নিজের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। তিনি জানিয়ে দিলেন যে, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনও তাড়াহুড়ো করবে না। যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলে তিন মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

চুক্তি এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশাবাদী হলেও, হোয়াইট হাউস এখন বলেছে যে- চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে।

ইরান শান্তি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প কী বললেন?
প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে ট্রাম্প জানান যে, তিনি আলোচকদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তাঁরা ‘চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনও তাড়াহুড়ো না করেন’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন যে, ইরানের সঙ্গে যেকোনও চুক্তিকে কেবল দ্রুত সম্পন্ন করলেই চলবে না, বরং তা হতে হবে ‘সুদৃঢ় এবং দীর্ঘস্থায়ী’। ট্রাম্প বলেন, “উভয় পক্ষকেই যথেষ্ট সময় নিয়ে কাজ করতে হবে এবং বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।”

ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসনের গৃহীত কৌশলেরও জোরালো সাফাই গান এবং বলেন যে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।

ট্রাম্প, ওবামা আমলের সেই চুক্তিকে ‘এযাবৎকালের অন্যতম জঘন্য চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে, ওই চুক্তির মাধ্যমেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান আলোচনাটি ছিল ‘তার ঠিক উল্টো’।

হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ অব্যাহত থাকছে:
ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানের নৌ-চলাচলের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর যে অবরোধ চলছে, একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তা পূর্ণ শক্তিতেই বলবৎ থাকবে।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এই অবরোধ শুরু হয় এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর আশেপাশে ইরানের বাণিজ্যিক ও সামরিক নৌ-চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ট্রাম্প বলেন, যতক্ষণ না চুক্তিটি ‘সম্পন্ন, অনুমোদিত এবং স্বাক্ষরিত’ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অবরোধ ‘পূর্ণ শক্তি ও কার্যকারিতার’ সঙ্গেই অব্যাহত থাকবে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। সংঘাত শুরুর আগে, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হত। এই বিধিনিষেধ বা অবরোধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ এবং তেলের দাম নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত:
এদিকে, সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, চুক্তির আলোচকরা এখনও বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এবং চুক্তিটি চূড়ান্ত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান যে, এখনই কোনও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি এখনও ‘ধীরগতিসম্পন্ন এবং অস্বচ্ছ’ রয়ে গিয়েছে। অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুসারে মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন “নির্দিষ্ট কিছু খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে এখনও আলোচনা-পাল্টা আলোচনা চলছে। কিছু শব্দ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আবার কিছু শব্দ তাদের কাছে।” 

হোয়াইট হাউস মনে করে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই এই চুক্তির সামগ্রিক রূপরেখাকে অনুমোদন দিয়েছেন। যদিও তেহরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, বিশ্বকে এই মর্মে আশ্বস্ত করতে তাঁর দেশ প্রস্তুত যে, তারা কোনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, ইরান তার "সম্মান ও মর্যাদা"-র প্রশ্নে কোনও আপস করবে না।

ইরান-ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম' অভিযোগ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বাজেয়াপ্ত অর্থ মুক্তির বিষয়ে তেহরানের দাবির ক্ষেত্রে।

ইরান বিষয়ক প্রস্তাবিত রূপরেখা:
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই খসড়া রূপরেখায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সমুদ্রপথে আরোপিত বিধিনিষেধগুলো পর্যায়ক্রমে শিথিল করার বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তিতে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি এবং সমুদ্রপথগুলি পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে ইরান "নীতিগতভাবে" সম্মত হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আরও দাবি করেন যে, ইরান তাদের কাছে মজুদ থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। যদিও এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে।

আলোচনায় উঠে আসা সম্ভাব্য সমাধানগুলোর মধ্যে একটি হলল- রাষ্ট্রসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থার তত্ত্বাবধানে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে লঘু বা কম ঘনত্বের পর্যায়ে নিয়ে আসা।

ট্রাম্প প্রশাসন চায়, চূড়ান্তভাবে যে চুক্তিই স্বাক্ষরিত হোক না কেন, তাতে ইরানের কাছে মজুদ থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সম্পূর্ণ ভাণ্ডারটিই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। যার পরিমাণ আনুমানিক ২,০০০ কিলোগ্রাম বলে ধারণা করা হয়।

প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ বা 'মোরাটোরিয়াম' জারির বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও আলোচকরা এখনও ঠিক করছেন যে, এই ধরনের বিধিনিষেধ কতদিন বলবৎ থাকবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, "আমরা চাই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার ব্যাপারে ইরানের তরফে একটি জোরালো ও সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দেখতে।"

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমালোচনা:
আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসা এই সম্ভাব্য চুক্তিটি মার্কিন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট- উভয় দলের পক্ষ থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছে।
চুক্তির বিরোধীরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, বর্তমান রূপরেখাটি অনেকটাই ২০১৫ সালের সেই পারমাণবিক চুক্তির মতোই, যা থেকে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে নিজেই সরে এসেছিলেন।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এই প্রস্তাবিত রূপরেখাকে "যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্থিতাবস্থা" হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তেহরানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে অসন্তুষ্ট রক্ষণশীল মিত্রদের সমালোচনারও কড়া জবাব দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত যে চুক্তিই স্বাক্ষরিত হোক না কেন, তা হবে "একটি ভাল ও যথাযথ চুক্তি"।

জ্বালানি সংকট অব্যাহত
হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত এবং আরোপিত বিধিনিষেধগুলো বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে তেল, জ্বালানি, সার এবং খাদ্যের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী দাবি করেছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের অনুমতি নিয়ে মাত্র ৩৩টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। অথচ এই সংঘাত শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করত। একজন ইরানি সামরিক উপদেষ্টা আরও বলেছেন যে, কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণের আইনি অধিকার তেহরানের রয়েছে।

শিল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল কার্যক্রম সম্ভবত ২০২৭ সালের আগে পুরোপুরি হবে না।

এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং সমগ্র অঞ্চল জুড়ে প্রতিশোধমূলক হামলার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। এদিকে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন ও ইজরায়েলের সমন্বয় "বেশ ঘনিষ্ঠ" রয়েছে। যদিও ইজরায়েলি কর্মকর্তারা, এ বিষয়ে সন্দিহান যে, ইরানের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত এই চুক্তিটি আদৌ অনুমোদন করবে কি না।