আজকাল ওয়েবডেস্ক: দেশের হয়ে নানা দায়িত্ব পালন করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনির। সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনার পাশাপাশি তিনি কূটনীতিতে (যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার সময় দেখা গিয়েছিল) সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আবার পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণেও যুক্ত। এর ফাঁকেও তিনি ভারত-বিরোধী বক্তব্য রাখার জন্যও সময় বের করেন। এখন তাঁর দায়িত্বের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে চলেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে এবার দেশটির অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধের দায়িত্বও সামলাতে হবে।
পাক সংবাদপত্র 'দ্য ডন'-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে সিনেটের এক বৈঠকে পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোস্তফা কামাল এই ঘোষণা করেছেন। ২৫ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে পাকিস্তান বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে পাকিস্তান দুনিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম জনবহুল দেশে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা। তীব্র অর্থসংকটে জীর্ণ পাকিস্তানের জন্য বিপুল জনসংখ্যা বিপর্যয়ের সমান।
অসীম মুনিরের নতুন ভূমিকা:
সংকটের মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভরসা অসীম মুনির। জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবিলায় শরিফ একটি কমিটি গঠন করেছেন, যাতে মুনিরকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 'দ্য ডন'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি এখন সরকারের কাছে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে রয়েছে।
পাক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "সরকার এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং প্রতিটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।"
মুনিরের জন্য এই নতুন দায়িত্ব এমন এক সময়ে এসেছে যখন পাকিস্তান ইতিমধ্যেই বালুচিস্তান ও আফগান সীমান্তের কাছে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। তাছাড়া, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও পুলিশের বাড়াবাড়ির জেরে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) অস্থিরতা দিন দিন আরও বাড়ছে।
এই সপ্তাহের শুরুর দিকে, অশান্ত বালুচিস্তান প্রদেশে বালুচ বিদ্রোহী ও টিটিপি জঙ্গিদের হামলায় পাকিস্তানের ৪২ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তেও উত্তেজনা রয়েছে।
এমন স্পর্শকাতর সময়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব সেনাপ্রধানের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যে হাসাহাসি ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শুরু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, সোশ্যাল মিডিয়া মিম ও কৌতুক-এ ভরে গিয়েছে। সবাই সেনাপ্রধানের এই নতুন ভূমিকা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করছেন। এক্স ব্যবহারকারীরা টুইটে প্রশ্ন তুলছেন, "(অসীম) মুনির এখন কী করবেন? কন্ডোম বিতরণ করবেন?"
এতসবের পরেও নতুন দায়িত্ব নিয়ে অসীম মুনিরকে টু-শব্দও করতে শোনা যায়নি।
পাকিস্তানের জনসংখ্যায় এই বিপুল বৃদ্ধির কারণ কী?
স্বাস্থ্য বিভাগ যেসব মূল কারণ চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হল গর্ভনিরোধক সামগ্রীর অভাব। পাকিস্তানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গর্ভনিরোধক পণ্যের ওপর কর ছাড়ের পরিকল্পনা করছে।
আরেকটি কারণ হল প্রদেশগুলোর মধ্যে রাজস্ব বরাদ্দ। বর্তমানে প্রদেশগুলোর মধ্যে সম্পদ বণ্টনের প্রায় ৮০ শতাংশই জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে করা হয়। এর ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রদেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার একটি মদত তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই বরাদ্দের হার ৫০ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে এমন পদক্ষেপ বিপুল জনসংখ্যার প্রদেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, পাঞ্জাব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ এবং এটি ‘শরিফ’ পরিবারের শক্ত ঘাঁটি। বর্তমানে পাঞ্জাব রাজনীতি ও সেনাবাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এখানেই অবস্থিত। তাই রাজস্ব প্রাপ্তি কমিয়ে দেয় এমন কোনও প্রস্তাবে প্রদেশটি খুব একটা খুশি নাও হতে পারে।
বর্তমানে পাকিস্তানে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৫৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই হার অব্যাহত থাকলে তা দ্রুতই দেশটির সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে। উপসাগরীয় দেশ ও বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর ঋণের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির কোনও দেশের জন্য পরিস্থিতিটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়াবে।















