আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হয়েছিল, সেখানে এবার উল্টো রথের টান দেখা যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে সংখ্যাটি খুব ছোট মনে হতে পারে— আগে যেখানে প্রতি ১০ জন মা গড়ে ২৩টি সন্তানের জন্ম দিতেন, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। অর্থাৎ, দেশটির গড় প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ২.৩ থেকে সামান্য বেড়ে ২.৪ হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামান্য ০.১ শতাংশের বৃদ্ধি আসলে একটি আসন্ন সংকটের পূর্বাভাস, যা দেশের সীমিত সম্পদের ওপর এক বিশাল ও মারাত্মক চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে। ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক 'মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে' (মিক্স)-র রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক তথ্যটি সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ার মূল কারণ হল এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। নতুন অনুমান অনুযায়ী, প্রজনন হারের এই সামান্য বৃদ্ধির কারণে আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে আরও ৫৮ লাখ এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ৯৬ লাখ বেশি বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, আগামী এক দশকের মধ্যে প্রায় এক কোটি অতিরিক্ত মুখের দায়িত্ব নিতে হবে এই ছোট্ট এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশটিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষকেরা এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) কর্মকর্তারা একযোগে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য খাত এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য চরম নেতিবাচক বার্তা বহন করছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে দেশের পরিবার পরিকল্পনা খাতের এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়। পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর (ডিজিএফপি) বর্তমানে তীব্র জনবল সংকট এবং মাঠপর্যায়ে সেবার অভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে এই দপ্তরের প্রায় ২৭ শতাংশ পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। কোনও কোনও জেলায়, যেমন মুন্সিগঞ্জে, অর্ধেকেরও বেশি পদ খালি। মাঠপর্যায়ের একজন কর্মী যেখানে আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছে দিতেন এবং পরামর্শ দিতেন, এখন জনবল সংকটের কারণে তাঁদের পক্ষে একেকটি পরিবারে ৯ মাসে একবার যাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ফলে সাধারণ ও দরিদ্র দম্পতিরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন।
জনবল সংকটের চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর চরম ঘাটতি। গত ২০২৪ সালের শুরুর দিক থেকেই দেশের সরকারি সরবরাহ চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে শুরু হওয়া এই সংকট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদেও কাটেনি। দেশের কোনও আঞ্চলিক সরকারি গুদামেই এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, কনডম বা ইমপ্ল্যান্টের ন্যূনতম মজুত নেই। ফলে, গরিব পরিবারগুলো যেখানে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে এই সামগ্রী পেত, তা এখন বন্ধ। বাধ্য হয়ে মানুষ চড়া দামে বাণিজ্যিক বাজার থেকে এগুলো কিনছে, যা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের হারে (সিপিআর), যা ৬২.৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের দীর্ঘদিনের অবহেলাই আজ এই খাতকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একসময় জনসংখ্যাকে সমস্যা না ভেবে সম্পদ ভাবার কথা বলেছিলেন, যার ফলে মাঠপর্যায়ে এই কর্মসূচির গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। দীর্ঘ ১৫ বছরে জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিলের বৈঠক হয়েছে মাত্র একবার। এমনকি প্রতি বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল অনুষ্ঠানেও দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি দেখা যায়নি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে একীভূত করার প্রশাসনিক টানাপোড়েন এই দপ্তরের কর্মকর্তাদের আরও হতাশ ও নিষ্ক্রিয় করে তোলে।
বর্তমানে দেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরাসরি কোনও রূপরেখা ছিল না, তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় পরিবার পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং খুব দ্রুত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আশ্বাস নয়, ২০২৫-২০৩০ সালের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলগত পরিকল্পনা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বাংলাদেশকে যদি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তবে যেকোনও মূল্যে প্রজনন হারকে আবার ২.১ বা প্রতিস্থাপন যোগ্য মাত্রায় নামিয়ে আনার কোনও বিকল্প নেই।















