আজকাল ওয়েবডেস্ক: আজ মহাকাশে যেন এক প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছিল সূর্য। আমাদের এই নিকটতম নক্ষত্রটি হঠাৎ করেই এক প্রচণ্ড 'মেজাজ' দেখাল, আর তার আঁচ মুহূর্তের মধ্যেই টের পেল পৃথিবী। সূর্যের বুক থেকে আজ আছড়ে পড়েছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী 'এক্স-ক্লাস' (X-class) সোলার ফ্লেয়ার বা সৌর শিখা। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সৌর বিস্ফোরণের তালিকার সবচেয়ে শক্তিশালী বিভাগ। এই বিস্ফোরণের ফলে আলোর গতিতে ছুটে আসা বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বিকিরণের একটি প্রচণ্ড ঢেউ সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধাবিত হয়, যার ফলস্বরূপ গ্রহের সূর্যালোকিত অংশে এক শক্তিশালী রেডিও ব্ল্যাকআউট বা বেতার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সূর্যকে যদি একটি প্রেশার কুকারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে বলা যায় তার ভেতরের প্রচণ্ড চাপ মাঝে মাঝেই বিপজ্জনকভাবে বাইরে বেরিয়ে আসে। সূর্যের পৃষ্ঠে থাকা সানস্পট বা সৌর কলঙ্কগুলোর কাছে যখন জটিল চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো হঠাৎ ছিঁড়ে যায়, তখনই এই ধরনের অকল্পনীয় শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটে, যাকে আমরা সৌর শিখা বলি। বিজ্ঞানীরা এদের শক্তি অনুযায়ী এ, বি, সি, এম এবং এক্স—এই পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করেন। প্রতিটি ধাপ তার আগের ধাপের চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী, আর 'এক্স-ক্লাস' এই ধাপের একদম ওপরে অবস্থান করে। আজকের এই বিস্ফোরণটি কেবল আলোই ছড়ায়নি, বরং এটি মহাকাশে ছড়িয়ে দিয়েছে প্রচুর পরিমাণে এক্স-রে এবং চরম অতিবেগুনি বিকিরণ, যা মাত্র আট মিনিটের মধ্যেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে।

আমাদের বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ৬০ থেকে ১,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় আয়োনোস্ফিয়ার নামে একটি বিদ্যুৎচালিত কণার আস্তরণ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে উচ্চ-কম্পাঙ্কের রেডিও তরঙ্গগুলো এই স্তরে বাধা পেয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে, ঠিক যেমনটা জলের ওপর ঢিল ছুড়লে তা লাফিয়ে এগিয়ে যায়। এই পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করেই পাইলট, নাবিক এবং জরুরি পরিষেবাগুলো বছরের পর বছর যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে। কিন্তু আজকের এই এক্স-ক্লাস শিখাটি আসার পর সেই আয়োনোস্ফিয়ারের নিচের দিকের স্তর বা 'ডি-লেয়ার'-কে অতিরিক্ত চার্জ করে দেয়। এর ফলে ইলেকট্রনগুলো এত দ্রুত এবং প্রবলভাবে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেতে শুরু করে যে, যেকোনও  রেডিও তরঙ্গ সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলে। সহজ কথায়, সিগন্যালটি ফিরে না এসে ওই স্তরেই বিলীন হয়ে যায়, আর তৈরি হয় ব্ল্যাকআউট। 

সাধারণত এই ধরনের ব্ল্যাকআউট কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং যেহেতু সূর্যের আলো এই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে, তাই পৃথিবীর কেবল দিনের বেলা থাকা অংশগুলোই এর কবলে পড়ে। তবে দুশ্চিন্তার এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের শিখা মাঝেমধ্যে 'করোনাল মাস ইজেকশন' বা সিএমই-এর জন্ম দেয়। এটি মূলত চুম্বকীয় প্লাজমার একটি বিশাল বুদবুদ, যা কিছুটা ধীরগতিতে চলে এবং এক থেকে তিন দিনের মধ্যে পৃথিবীতে পৌঁছায়। যদি তেমন কিছু ঘটে, তবে আগামী দিনে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় হতে পারে, যা আমাদের স্যাটেলাইট, জিপিএস সিস্টেম এবং এমনকি বৈদ্যুতিক গ্রিডকেও তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের ঘরের আলোগুলো জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু মহাশূন্যের এই বিশাল তাণ্ডবে আজকের শর্টওয়েভ রেডিও যোগাযোগ যে এক অভাবনীয় ধাক্কা খেয়েছে, তাতে কোনও  সন্দেহ নেই।