আজকাল ওয়েবডেস্ক: সাহারার বিশাল মরুভূমিতে এক রোমাঞ্চকর অভিযানের সময় বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেলেন ডাইনোসরের এক নতুন প্রজাতির জীবাশ্ম। প্রায় উপন্যাসের মতো নাটকীয় এই অভিযানে পশ্চিম আফ্রিকার নাইজারে ৯৫ মিলিয়ন বছর পুরনো এক নতুন স্পিনোসরাসের অস্তিত্বের সন্ধান মিলেছে। এই নতুন প্রজাতির নাম দেওয়া হয়েছে Spinosaurus mirabilis। ল্যাটিন শব্দ mirabilis অর্থ “অবিশ্বাস্য” বা “অদ্ভুত”—যা আবিষ্কারটির গুরুত্বই তুলে ধরে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Science-এ।

এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী পল সেরেনো। তাঁর কথায়, “এটা নিঃসন্দেহে শতাব্দীর অভিযান। এমন অভিজ্ঞতা হয়তো আর কখনও হবে না।” ২০২২ সালে সাহারার দুর্গম এলাকায় এই অভিযানে প্রায় ৫৫ টন জীবাশ্ম সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যেই ছিল নতুন প্রজাতির এই স্পিনোসরাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষকদের মতে, এই ডাইনোসরটি আকারে প্রায় Tyrannosaurus rex-এর সমান ছিল।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রাণীটির মাথায় একটি বড় ও উজ্জ্বল রঙের কাস্তে আকৃতির ঝুঁটি ছিল, যা কেরাটিনে ঢাকা ছিল। এছাড়া এর দাঁতের গঠন ছিল বিশেষ ধরনের—একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে থাকা ধারালো দাঁত, যা দিয়ে সহজেই পিচ্ছিল মাছ ধরা সম্ভব হত। পল সেরেনোর মতে, “এই ডাইনোসরকে আমি এক ধরনের ‘নরকীয় বক পাখি’-র মতো কল্পনা করি। শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে দুই মিটার গভীর হলেও শিকার ধরতে পারত, যদিও সম্ভবত অগভীর জলে বড় মাছের অপেক্ষায় থাকত।”

এই আবিষ্কারের গল্প শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের একটি গবেষণা থেকে। সেখানে এক ফরাসি ভূতত্ত্ববিদ নাইজারের একটি ছোট এলাকায় একটি ডাইনোসরের দাঁত পাওয়ার কথা লিখেছিলেন। কিন্তু সেই আবিষ্কারের কোনও ছবি বা বিস্তারিত তথ্য ছিল না। সেরেনোর কথায়, “৭০ বছরের বেশি সময় ধরে কেউ আর সেই জায়গায় ফিরে যায়নি। আমার কাছে জায়গাটি যেন এক ধরনের ‘শাংগ্রি-লা’ হয়ে উঠেছিল।”

২০১৮ সালে তিনি ও তাঁর দল সেই জায়গার কাছাকাছি পৌঁছলেও কঠিন মরুভূমি পরিস্থিতির কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হন। পরের বছর তারা আবার ফিরে এসে ড্রোন ও জিপিএসের সাহায্যে জায়গাটি খুঁজে বের করেন। কিছু জীবাশ্ম পাওয়া গেলেও বড় কোনও আবিষ্কার তখনও হয়নি।
ঠিক তখনই এক স্থানীয় তুয়ারেগ ব্যক্তি গবেষকদের শিবিরে এসে জানান যে তিনি বড় হাড়ের অবস্থান জানেন। গবেষকরা জ্বালানি মজুত করে তাঁর সঙ্গে মরুভূমির গভীরে যাত্রা শুরু করেন।

সেরেনো বলেন, “দেড় দিন গাড়ি চালানোর পর আমরা প্রায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম—ফিরে আসার মতো জ্বালানি থাকবে কি না। ঠিক তখনই তিনি আমাদের জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় হাড়টির কাছে নিয়ে গেলেন।” সেই জায়গা থেকে একটি স্পিনোসরাসের দাঁত ও সম্ভবত চোয়ালের অংশ পাওয়া যায়। পরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা যায় এটি সত্যিই স্পিনোসরাসের চোয়াল। তবে আরেকটি অদ্ভুত হাড়ের অংশ তখনও তাদের ধাঁধায় ফেলেছিল।


কোভিড মহামারি ও অর্থের অভাবে কয়েক বছর অভিযান বন্ধ ছিল। পরে এক গোপন দাতার অর্থ সহায়তায় ২০২২ সালে আবার অভিযান শুরু হয়। এবার ২০ জন গবেষক এবং নিরাপত্তার জন্য ৬৪ জন সশস্ত্র রক্ষী নিয়ে দলটি মরুভূমির সেই দুর্গম অঞ্চলে ফিরে যায়। অভিযানের প্রথম দিনেই গবেষক Daniel Vidal আরও একটি ঝুঁটির অংশ খুঁজে পান। তখনই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন এটি শুধু স্পিনোসরাসই নয়, সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। সেরেনো বলেন, “আমরা বুঝতেই পারছিলাম না আনন্দে কী করব। অনেকে তখন আবেগে কেঁদে ফেলেছিল।”


স্পিনোসরাসকে আগে অনেকেই প্রায় জলজ প্রাণী বলে মনে করতেন। কিন্তু সেরেনোর মতে, নতুন আবিষ্কারটি সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। কারণ এই জীবাশ্মগুলি সমুদ্র থেকে শত শত মাইল দূরে পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “এটি পুরোপুরি জলজ প্রাণী ছিল না। এর কঙ্কাল পাখির মতো ফাঁপা এবং শরীর তুলনামূলক শক্ত ছিল। সাঁতার কাটার জন্য উপযুক্ত ছিল না।”

গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার স্পিনোসরাসের বিস্তৃতি ও বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন তথ্য দেবে। আগে উত্তর আফ্রিকা ও ব্রাজিলে এই ডাইনোসরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে—এই দুই অঞ্চলের মধ্যে তারা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নতুন এই আবিষ্কার সেই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর সেই গবেষণার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে সাহারার মরুভূমিতেই।