আজকাল ওয়েবডেস্ক: স্বর্গ কি সত্যিই মহাবিশ্বের কোনও স্থানে অবস্থিত? এমনই এক বিতর্কিত ধারণা সামনে এনেছেন মাইকেল গুলিয়ান। তিনি হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালের পদার্থবিজ্ঞানের প্রফেসর। সম্প্রতি এক মতামতে তিনি দাবি করেন, আমরা যাকে ‘স্বর্গ’ বলি, তা হয়তো অবস্থিত ‘কসমিক হরাইজন’-এর ওপারে—যে সীমানার পরের অংশ আমাদের কাছে চিরতরে অদৃশ্য।
এই ধারণার পেছনে তিনি উল্লেখ করেন এডইউন হাবলের সূত্রকে। হাবলের সূত্র অনুযায়ী, কোনও গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত, তা তত দ্রুত গতিতে আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর সরে যাওয়ার গতি আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে গুইলেনের বক্তব্য, কসমিক হরাইজন এমন এক সীমানা যার ওপারে থাকা অঞ্চল আমরা কখনই দেখতে বা পৌঁছাতে পারব না। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এই দূরত্ব প্রায় ৪৩৯ বিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
তবে এই মতবাদকে অনেক বিজ্ঞানীই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কানেকটিকাট কলেজের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞান অধ্যাপক, বলেন যে কসমিক হরাইজন কোনও ভৌত দেওয়াল বা নির্দিষ্ট স্থান নয়। এটি আসলে এমন একটি সীমা, যার বাইরে থেকে আলো এখনও পৃথিবীতে পৌঁছানোর সুযোগ পায়নি। মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, আর আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার বেগে চলে। ফলে আমরা কেবল সেই অঞ্চলগুলোই দেখতে পাই, যেখান থেকে আলো এই সময়ের মধ্যে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। এর মানে এই নয় যে, সেই সীমানার পর মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নেই।
গুইলেন তাঁর যুক্তিতে আরও উল্লেখ করেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের কথা। তাঁর ব্যাখ্যায়, কসমিক হরাইজনের প্রান্তে সময় কার্যত থেমে যায়—সেখানে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনও পার্থক্য থাকে না। স্বর্গ যদি ‘চিরন্তন’ বা ‘সময়হীন’ কোনও অবস্থান হয়, তবে সেটি এমন এক জায়গাতেই হওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এছাড়া তিনি দাবি করেন, কসমিক হরাইজনের কাছাকাছি অঞ্চলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন জ্যোতিষ্কগুলো অবস্থান করছে। তাঁর মতে, এরও ওপারে এমন কিছু থাকতে পারে যা তথাকথিত বিগ ব্যাং-এর আগের সময়কে নির্দেশ করে। যদিও এই ধারণা মূলধারার বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত বিতর্কিত এবং অনেকেই এটিকে বিজ্ঞানের চেয়ে দর্শন বা আধ্যাত্মিকতার আলোচনায় ফেলতে চান।
আসলে প্রশ্নটি বিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বাস ও দর্শনের পরিসরে প্রবেশ করে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে বিগ ব্যাং তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখলে সেটিও একধরনের ‘সৃষ্টিতত্ত্বের ভাষা’ হয়ে উঠতে পারে—এমন মতও দিয়েছেন কিছু বিজ্ঞানী। ফলে স্বর্গের অবস্থান নিয়ে এই আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান যতই অগ্রসর হোক, কিছু প্রশ্ন এখনও রহস্যের আবরণেই ঢাকা রয়ে গেছে।
